মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪২ অপরাহ্ন
শিরোনাম
চৌগাছায় প্রথম দিনে অনুপস্থিত ৫৩ পরীক্ষার্থী ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে যৌন নিপীড়নকে হাতিয়ার করছে ইসরাইলিরা রেশন দুর্নীতির মামলায় ইডির জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি নুসরাত! এপ্রিলের ২০ দিনেই এলো ২২২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স হরমুজে ইরানের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা, ক্রিপ্টোতে ট্রানজিট ফি দাবি বিএনপি জোট শরিকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে: সারজিস জামায়াত আমিরের সঙ্গে জার্মান রাষ্ট্রদূতের বৈঠক, যেসব আলোচনা হলো হরমুজ ইস্যুতে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্টের ফোনালাপ ভারতীয় বিমানের ওপর পাকিস্তানের আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ল সংসদে ১৩৩ অধ্যাদেশের ৯৭টিই বিল আকারে আইনে রূপান্তর

রাজনীতিতে শিষ্টাচার-শুদ্ধাচারের আবশ্যকতা

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫৮ Time View

নিউজ ডেক্সঃ  পক্ষ-বিপক্ষ, ভিন্নমত-মতবিরোধ এমন কি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা রাজনীতির উপাদানের মতো। এগুলো রাজনীতি ও রাজনীতিকদের বৈশিষ্ট্যও। পরনিন্দা চর্চাও চলে। কিন্তু, পারস্পরিক অশ্রদ্ধা ও ভাষার দুরবস্থা কখনোই সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ পছন্দ করে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথাবার্তায় খিঁচুনি-ভ্যাঙচি, খোঁচা, সর্বোপরি গালমন্দে মানুষ কতো বিরক্ত ছিল এর একটা ছাপ চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ক্রিয়াকর্মেও দেখা গেছে। পতন বা ক্ষমতাচ্যুত হলেও কাউকে নিয়ে এ ধরনের ট্রল-ব্যঙ্গ হতে পারে, তা বিরল ঘটনা। 

টানা ক্ষমতাকালে শেখ হাসিনা নিজে তা হয় তো উপলব্ধির দরকার মনে করেননি। হিতাকাঙ্ক্ষীদের কেউ তাকে কখনো তা জানিয়েছেন বা সতর্ক করেছেন বলেও তথ্য নেই। খেলা হবে, খেলা হবে; তলে তলে ঠিক হয়ে গেছে– এ ধরনের ভাঁড়ামিতে তার সেকেন্ড ইন কমান্ড ওবায়দুল কাদের বা হাছান মাহমুদরাও ভাষাদোষে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সর্বনাশ কম করেননি। কথায় কথায় প্রতিপক্ষকে নিম্নমানের শব্দ-বাক্যে তাচ্ছিল্য করে কাদের, হাছান, ইনু, হানিফরা নিজেরা একটা পর্যায়ে স্রেফ ক্লাউনে পরিণত হয়েছেন।

শিষ্টাচারহীনতা, ভাষাগত বিকারগ্রস্ততার করুণ পরিণতি তো মাত্র বছরখানেক আগের ঘটনা। সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার নমুনা নেই। বরং গজবের মতো এর যেন নতুন চাষাবাদ। তাও আবার এক সময়ের সেই মার্জিত-সাহসীদের মুখে-আচরণেও। স্কুলশিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র মেরামত আন্দোলনের স্লোগান কী মার্জিত-রুচিসম্মত-সৃজনশীলই না ছিল । ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমিই বাংলাদেশ’। যা মানুষের চিন্তা জগতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্লোগানও ছিল বুদ্ধিদীপ্ত। ‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে, হয়ে গেলাম রাজাকার’। ‘আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকেই গুলি করে’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’। ‘বন্দুকের নলের সাথে ঝাঁজালো বুকের সংলাপ হয় না’।

মস্তিষ্কে ঝড় তুলে দেওয়া এসব স্লোগানের পর এখন অশ্লীলতা-রুচিহীনতার পথে হাঁটছে। এ ধরনের মনকাড়া স্লোগান ও বক্তব্যের এ প্রজন্মই এখন কীসব শব্দবোমা ছুড়ছে? মুখ দিয়ে যা আসছে বলছেন। মুখের ভাষার সাথে শরীরের ভাষায়ও দুর্গন্ধ। মুখের মূল কাজ কথা বলা ও খাওয়া। তবে, মোটেই যা ইচ্ছা তা বলা মুখের কাজ নয়, যা ইচ্ছা তা খাওয়াও নয়। রাজনীতিতে রুচিহীনতা বা অশ্লীলতা দিয়ে সস্তা দরে মাঠ কাঁপানো যায়। কিন্তু, মানুষ তা কোনোকালেই গ্রহণ করেনি। ক্ষণিক সময়ের জন্য নোঙরামিতে হাইপ তুলে ভাইরাল হওয়া এক জিনিস, আর প্রসিদ্ধি পাওয়া আরেক জিনিস। দিনশেষে রাজনীতিতে শিষ্টাচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার। নেতার মধ্যে শিষ্টাচার থাকলে তার কর্মীরাও সভ্য হয়। দলীয় ক্ষমতার মোহে কাউকে গালিগালাজ করলেই বড় হওয়া যায় না। বড় জোর কয়েক দিন আলোচিত হওয়া যায়। প্রতিবাদ অসভ্য ভাষায় কার্যকর হয় না। এতে মর্যাদা-সম্মান আগে নিজেরটা নষ্ট হয়। আর নিজের বা কারও সম্মানবোধ না থাকলে তো কথাই নেই।

হালে নতুন উদ্যমে ভিন্নমতকে গালিগালাজের যে বিকৃত-ধিকৃত চর্চা শুরু হয়েছে, তার বেশিরভাগই উচ্চারণের, লেখার অযোগ্য। অকথ্য এসব শব্দ ন্যূনতম সুস্থ সমাজেও বেমানান। চরম অসভ্যতাও। গালিগালাজকে রাজনীতির এ স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে আসা আগামীর জন্য খুব অশনি সংকেত। কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ অসামাজিকতায় কেবল শরিক নয়, মদদও দিচ্ছে। এ প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। কাউকে অপদস্থ করার উপযুক্ত মাধ্যমটির দিকে বেশ ঝোক কারও কারও। সম্মিলিতভাবে তারা দেশকে গালমন্দ ও ঘৃণা চাষের উর্বর ভূমি করে তুলছে। তা করতে গিয়ে সুস্থ আলোচনা, শালীন বিতর্ক, পাল্টাপাল্টি যুক্তির চেয়ে এখন বিতর্কিত কোনো একটি তকমা লাগানো, অশালীন ভাষার আমদানি, অর্ধসত্য বা খণ্ডিত তথ্যের প্রচার-প্রসার। সেখানে যুক্তির চেয়ে গালিগালাজ, মতবিরোধের জায়গায় অপমান, আর ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার বদলে বিদ্বেষ। সামগ্রিকভাবে তা একটি প্রজন্মকে নিয়ে যাচ্ছে রসাতলে। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যাচ্ছে তা আর জোয়ান-বুড়ার ফের মানছে না।

জুলাইবিপ্লবীদের হেদায়েত করতে গিয়ে সেদিন ঘটনাচক্রে দৃশ্যপটে আগমন এক সময়ের তুখোড় নেতা, সাবেক মন্ত্রী, প্রয়াত মানিক মিয়ার পুত্র আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর। ছেলেপেলেগুলোর ভাষা-আচরণ, স্লোগানে, বর্তমান সরকারের ভূমিকায় কী মাত্রায় অপমানিত বোধ করছেন, তা বলছিলেন তিনি। অবাক, বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, উপরোক্ত কথাগুলোর ফাঁকে তিনি নিজেও এমন সব শব্দ-বাক্য যোগ করেছেন, যা লেখা বা ছাপার অযোগ্য। প্রযুক্তির কল্যাণে স্যোশাল মিডিয়ায় রিল হয়ে ঘুরছে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কথাগুলো। ওই সময় তাকে কেউ বারণ করেননি এসব শব্দ উচ্চারণ না করতে। বরং তৃপ্তি পেয়েছেন, হাততালি দিয়েছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত জোয়ান-বুড়ারা।

স্বাভাবিকভাবেই তা ক্রমশ সংক্রমিত হচ্ছে রাজনীতিতে, সমাজে। জুলাই আন্দোলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন দলের নেতারা কথা বলেছেন, পরামর্শ নিয়েছেন। লন্ডন গিয়ে দেখাও করেছেন কেউ কেউ। সেখানে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাথে দেখা করা একটি দলের নেতারাও এক পর্যায়ে তারেক রহমান ও বিএনপি সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন তা রাজনীতির বাইরের মানুষকেও আহত করেছে, যা চরমভাবে রাজনৈতিক শিষ্টাচার পরিপন্থি। এত বড় একটি বিজয় তথা অভ্যুত্থানের কিছুদিন না যেতেই রাজনীতিতে প্রতিহিংসা, আক্রমণ, প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের অসহিষ্ণু প্রবণতার যে নতুন চাষাবাদ চলছে তা পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধের বিলুপ্তি ঘটাবে কি-না, এ প্রশ্ন ঘুরছে।

কুৎসিত, বিকৃত কথামালা ও কাদা ছোড়াছুড়ির জের যে কত বেদনার হয়, তা নতুন করে ভাবার বিষয় নয়। কেবল বছরখানেক আগের ঘটনা মনে করলেই হয়। নানা সমালোচনার পরও রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরাই সমাজকে পথ দেখান। ভালো-মন্দ যে পথ তারা দেখান দিনশেষে দেশ সেদিকেই যায়। তাই তাদের কাছ থেকে দেশের জনগণ শিখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছুদিন ধরে তারা এই সুন্দর ময়দানেও যে পাঠপঠন দিতে শুরু করেছেন, তা উদ্বেগ জাগাচ্ছে। সজ্জন ও আদর্শবান রাজনীতিবিদদের অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও রূঢ় করেছে এবং এটি কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও বিদ্যমান। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মানসিকতা এবং অসহিষ্ণুতা অব্যাহত থাকলে স্বাভাবিকভাবেই শিষ্টাচার কমে যাবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভদ্রতা ও নম্রতার চেয়ে পেশিশক্তি এবং দলীয় আধিপত্য বেশি গুরুত্ব পাবে। রাজনীতিকরা জনগণের শ্রদ্ধা হারাতে থাকবেন। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রাজনীতি কেবল দল বা ক্ষমতার লড়াই নয়। এটি আচরণ, শিষ্টাচার এবং নৈতিকতার প্রতিফলন। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে মানুষ মোটাদাগে সততা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা আশা করে।

রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতির দুনিয়া যতদিন থাকবে, ততদিন মতের অমিল থাকবে, বিরোধ থাকবে, কিন্তু তা অশালীন-শিষ্টাচারবিরোধী পথে? মোটেই না। এ পথে প্রতিপক্ষকে বিনাশ করা যায় না। নিজের অমরত্বও আসে না। বরং ভেতরে ভেতরে সমালোচিত হতে হয়। এক সময় ধিক্কৃত হয়ে বিতাড়নে পড়তে হয়। এর বিপরীতে শিষ্টাচারের জন্যই তাকে জনগণ শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। আইডল-আইকন হিসেবে তারা অনুকরণীয় হন। নইলে পতন বা মৃত্যুর পরও সমালোচনা-ঘৃণা অনিবার্য। সেই দৃষ্টান্ত দেশে-বিদেশে অসংখ্য।

অনলাইন নিউজ ডেক্সঃ
কুইক এন ভি/রাজ/২৭ আগস্ট ২০২৫/বিকালঃ ০৩.২০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

April 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit