আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আইডিএফ জানিয়েছে, এই হামলায় একটি সামরিক স্থাপনা, বিমান বিধ্বংসী কামান এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো লক্ষ্য করা হয়েছে। সিরিয়ার গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, হামা, দামেস্ক, দারা ও উপকূলীয় শহর লাতাকিয়ার কাছাকাছি এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলায় ইসরাইলি বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারও অংশ নিয়েছে।
আইডিএফ আরও জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম সিরিয়ার সুয়াইদা অঞ্চলে তাদের একটি হেলিকপ্টার অবতরণ করে এবং কয়েক মিনিট পর পাঁচজন আহত সিরীয় দ্রুজ নাগরিককে নিয়ে উড্ডয়ন করে। তাদেরকে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর সাফেদের জিভ মেডিকেল সেন্টারে স্থানান্তরিত করা হয়।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী আরও বলেছে, ‘দক্ষিণ সিরিয়ায় আইডিএফ সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং তারা দ্রুজ অধ্যুসিত গ্রামগুলোতে শত্রু বাহিনীর প্রবেশ রোধ করতে প্রস্তুত।’ যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের মতে, ইসরাইল প্রায় ২০টি বিমান হামলা চালিয়েছে – যা চলতি বছর সিরিয়ায় তাদের সবচেয়ে হামলা।
সৌদি মালিকানাধীন আল-হাদাত চ্যানেল দাবি করেছে যে, লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে বাশার আল-আসাদের সরকারের ব্যবহৃত একটি বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটিও রয়েছে। সিরিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থা সানা জানিয়েছে, দামেস্কের শহরতলির হাসরাতায় একজন নিহত হয়েছেন। শাম এফএম রেডিও স্টেশন জানিয়েছে, হামরাতায় চারজন ও লাতাকিয়ার কাছে আরও দুজন আহত হয়েছে। এছাড়া হামা এলাকায় চারজন আহত হয়েছেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের পতনের পর থেকে সিরিয়া তার দক্ষিণের বিশাল অংশজুড়ে ব্যাপক ইসরাইলি দখলদারিত্বের শিকার হয়েছে। সেই সঙ্গে গত পাঁচ মাস ধরে দেশজুড়ে ইসরাইলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। যার বেশিরভাগই চালানো হয়েছে আসাদের ফেলে যাওয়া সিরীয় সেনাবাহিনীর সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার ভোরে রাজধানী দামেস্কে সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের বাসভবনের কাছে বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। দেশটির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি, নতুন সিরীয় প্রশাসনের হাত থেকে সংখ্যালঘু দ্রুজ সম্প্রদায়কে রক্ষার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়েছে। যদিও দ্রুজ সংখ্যালঘুদের আসাদ সরকারকে সমর্থন করার এবং অধিকৃত গোলান মালভূমিসহ ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইতিহাস রয়েছে।
সাবেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও বর্তমানে ক্ষমতাসীন হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) প্রশাসনের আমলে সিরিয়ায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নতুন ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। যার ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে দামেস্কের কাছে এইচটিএস-সমর্থিত যোদ্ধা ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এই সহিংসতায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েক ডজন মানুষ হতাহত হয়েছে।
তবে সিরিয়ার আহমেদ আল-শারা প্রশাসন বলেছে, দ্রুজদের ওপর হামলায় সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আরও বলেছে, সিরিয়ার নাগরিকদের রক্ষা করার দায়িত্ব ইসরাইলের নয়। এ অবস্থায় আরব দেশগুলোর কাছে সহায়তা চেয়েছে সিরীয় নাগরিকরা। দ্রুজ অধ্যুষিত সুয়াইদা অঞ্চলে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা। তবে সংঘর্ষের ভয়ে এরমধ্যেই এলাকা ছেড়েছেন হাজারো বাসিন্দা।
জানা গেছে, ধর্মীয়ভাবে অবমাননাকর অডিও রেকর্ড ঘিরে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় উত্তপ্ত সিরিয়ার পরিবেশ। দ্রুজ অধ্যুষিত শহরগুলোর আশেপাশে সুন্নি ও দ্রুজ গোষ্ঠীর মধ্যে বিরাজ করছে উত্তেজনা। এই পরিস্থিতির মধ্যে শুক্রবার দামেস্কে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের কাছে ইসরাইলি হামলা নতুন করে শঙ্কায় ফেলেছে সিরিয়া প্রশাসনকে।
ইসরাইলের দাবি, দ্রুজ সম্প্রদায়কে রক্ষা করতেই সতর্কবার্তা হিসেবে এই হামলা চালিয়েছে তারা। প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, দামেস্কের দক্ষিণাঞ্চলে সিরীয় সেনা মোতায়েন এবং দ্রুজদের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এই হামলা স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
কিন্তু সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ডার আম্মার আল-হারিরি বলেন, দেশের মানুষকে রক্ষায় বদ্ধপরিকর তারা। দ্রুজ অধ্যুষিত সুইদা অঞ্চল সিরিয়ারই অংশ, তাই সেই অঞ্চলে প্রবেশ করা তাদের অধিকার বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘সুয়াইদা অঞ্চল সিরিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা চাইলেই সেখানে আমাদের সেনা মোতায়েন করতে পারি। নিজের দেশের সীমানার মধ্যে চলাফেরা করার জন্য আমাদের কারো অনুমতির প্রয়োজন নেই। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের নাগরিকদের রক্ষায় আমরা পিছপা হব না।’
সিরিয়ার বাসিন্দাদের ধারণা, দ্রুজদের কাঁধে বন্দুক রেখে আদতে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পাঁয়তারা করছে ইসরাইল। নেতানিয়াহু বাহিনীকে রুখতে তাই আরব দেশগুলোর কাছে সহযোগীতা চান তারা। যেমন এক সিরীয় বলছিলেন, আরব দেশগুলোর উচিত এর প্রতিবাদ করা। ইসরাইল সিরিয়ায় হামলা চালিতে যাচ্ছে। অথচ সব আরব দেশের প্রেসিডেন্টরা চুপ করে আছেন।
প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘ সিরিয়ায় ইসরাইলের এসব বিমান হামলার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। সিরিয়ার সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম। তিনি বলেছেন, ‘ইসরাইলি হামলার মুখে লেবানন সিরিয়ার সাথে সংহতি প্রকাশ করছে এবং সিরিয়ার ভূখণ্ডের ঐক্যের প্রতি সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
সিরিয়ায় জাতিসংঘের বিশেষ দূত গেইর পেডারসেন শনিবার এক এক্স পোস্টে বলেন, ‘আমি ইসরাইলের সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানাই, যার মধ্যে দামেস্কের উপকণ্ঠে এবং অন্যান্য শহরে বিমান হামলাও অন্তর্ভুক্ত, এবং আমি অবিলম্বে এই আক্রমণ বন্ধের আহ্বান জানাই।’
কিউএনবি/আয়শা/০৩ মে ২০২৫, /সন্ধ্যা ৭:৫০