জন্ম ও শিক্ষাজীবন: ডাঃ জাফরুল্লাহর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে। তাঁর বাবার শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। পিতামাতার দশজন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট উত্তীর্ণের পর তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।কলেজজীবনে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়াশোনার সময় অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন।এজন্যই তিনি শিক্ষার্থীদের মন জয় করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান: প্রশিক্ষণ শেষেই তিনি প্রবেশ করেন যুদ্ধের দেশ বাংলাদেশে। মুক্তিবাহিনীর একজন যোদ্ধা হিসাবে তিনি লড়াই করেন পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে। আগরতলায় তিনি পেয়ে গেলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাবেক জিএস ডাঃ এম এ মবিনকে। তার সাথে মিলেই ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট “বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল” প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা শুরু করলেন।
টগবগে যুবক ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দেয়া ছাড়াও আরেকটি কাজ শুরু করলেন। যুবক স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক নারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য জ্ঞান দান করেন যা দিয়ে তারা নার্স হিসাবে রোগীদের সেবা করত এবং তার এই অভূতপূর্ব সেবাপদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার “ল্যানসেট” এ প্রকাশিত হয়। তিনি যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং গণবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ লাভ করেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান:
আমরা সেই ২০১৮ সালের শুরুতে ডাকসু নির্বাচন, কোটা পদ্ধতির সংস্কার, চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধি , নিরাপদ হল এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস সহ শিক্ষার্থীবান্ধব কিছু দাবি নিয়ে আমরা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করি। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের ফলে আন্দোলনের সু্যোগ ছিল না। চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধির দাবিতে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ভয়ে নিরাপদ হল, নিরাপদ ক্যাম্পাস, চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধি ইত্যাদি দাবি বাদ দিয়ে ই ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ এর ব্যানারে ৫ দফা দাবিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসে।তখনও মিডিয়ার কর্মীর পাশাপাশি আন্দোলনের কর্মী,আন্দোলনের নেতা নয়।তবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। কৌশলগত কারণে কমিটিতে আমার নাম না রাখলেও শীর্ষ নেতাদের অনেকেই আন্দোলনের প্রয়োজনে আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতো।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ৩০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে নুরুল হক নুরের উপর হামলার পর ১ জুলাই আন্দোলনের নেতা রাশেদ খান এবং ২ জুলাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ফারুক হাসান সহ কয়েকজন নেতাকর্মী কে আটক করে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এতদিন ধরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে হাজার হাজার নেতাকর্মী ছিল। কিন্তু পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হামলায় ভয়ে অনেকেই আড়ালে চলে যায়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের চরম দুর্দিনে ৩ জুলাই দুপুরের পর আমি হাজির হলাম ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ধানমন্ডির অফিসে। তাকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানালাম এভাবেই-
“গত৩০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে নুরুল হক নুর কে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হামলার মুখে ফেলে অনেকেই চলে যায়। আমি নুরুল হক নুর কে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হামলা থেকে রক্ষা করতে ‘চ্যাংদোলা’ করে লাইব্রেরীর ভেতরে নিয়ে যায়।
নুর সহ আহতদের উদ্ধার এবং চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমি তাদের কে প্রয়োজনমতো সহযোগিতা করেছি। কিন্তু একজন ব্যক্তির সহায়তায় তো আন্দোলন টিকিয়ে রাখা কঠিন। তখন ৫/৬ জন শীর্ষ নেতা জেলহাজতে এবং নুরুল হক নুর ও হাসান আল মামুন আত্মগোপনে। আন্দোলনের মাঠে কেউই নেই।
সেই সময় নুরুল হক নুর (পরে ডাকসু ভিপি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম সহ আন্দোলনের অনেক সহযোদ্ধা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছে। সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসার দেয় নি।অসুস্থ অবস্থায় তারা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি।”
আমি সম্ভাব্য পরিস্থিতি অনুমান করে বললাম, “আমাদের পক্ষে বেশিদিন চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব নয়। তাই আপনার এখানে তাদের চিকিৎসা দরকার। আন্দোলন টিকিয়ে রাখতে ভবিষ্যতে আরও সহযোদ্ধা আহত হতে পারে। তাই আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিন”।
কোটা সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে আমার সংক্ষিপ্ত ব্রিফ শেষে আমি জাফরুল্লাহ চৌধুরী কে বললাম, “আন্দোলনে আপনার সহযোগিতা একান্ত দরকার। না হলে এই আন্দোলন টিকিয়ে রাখা কঠিন। আপাতত চিকিৎসা সেবা আমাদের কে দেন। আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাই কোটা সংস্কারের দাবিতে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য দায়িত্ব নিতে হবে আপনাকে”।
ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী তখনও কোটা সংস্কার আন্দোলনের নুরুল হক নুর, রাশেদ খান, ফারুক হাসান, হাসান আল মামুন সহ কাউকে চিনে না।তাই আমার অনুরোধে সাড়া দিলেন।তাই তিনি বললেন, “আমি অফিসে বলে দিচ্ছি তোমার রেফারেন্স দিয়ে অথবা কোটা সংস্কার আন্দোলনের কোনো কর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসলে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে। তিনি আমার সামনেই হাসপাতালের পরিচালক কে বলে দিলেন। পরে আমি তার সাথে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর রেফারেন্স দিয়ে কথা বলি।”
তিনি আরো বলেন ,”আমি ‘স্যার’ সম্বোধন করা পছন্দ করি না। আমাকে ‘বড় ভাই’ বলে ডাকবে”।তখন থেকেই আমি তাকে ‘বড় ভাই’ বলে ডাকি।
জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে বৈঠক শেষে আমি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তা সবার উদ্দেশ্যে জানিয়ে দিলাম। আমার বিভাগের এক ছোট ভাই আমার এবং ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর যৌথ ছবি তুলেছেন। আমি সেই ছবি সহ ফেসবুকে পোস্ট করলাম। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নিচে অফিসে গিয়ে হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী একটি স্বাস্থ্য বীমার চেক বই ইস্যু করলাম।
সেইদিন আমার সাথে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর যে স্বাস্থ্য বীমা চুক্তি হয়েছিল, সেই চুক্তি অনুযায়ী এখনো ছাত্র অধিকার পরিষদের কেউ অসুস্থ হলে গণস্বাস্থ্য নগর কেন্দ্র হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং চিকিৎসা সেবা নেয়। আমিও অন্তত দুইবার চিকিৎসা সেবা নিয়েছি।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান :
কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাঝখানে ২০১৮ সালে ২৯ জুলাই শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব এবং দিয়া সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাদের মৃত্যু কে কেন্দ্র করে “নিরাপদ সড়ক চাই” আন্দোলন শুরু হলে আমি আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে আন্দোলন কে চাঙ্গা করতে চাইলাম। সেদিন অনেক সিনিয়র নেতাদের পিছুটান দেখেছি।
নুরুল হক নুর এবং হাসান আল মামুন কথা দিয়েও জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্সে আসে নাই। অবশেষে ৩ আগস্ট রোজ শুক্রবার বিকেলে আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই বিন ইয়ামিন মোল্লাকে নিয়ে আমরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রেস কনফারেন্স করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে আমরা মাঠে নামি।
৬ আগস্ট গভীর রাতে গাজীপুর থেকে রাতুল সরকার কে আটক করে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। তাকে তিন দফা রিমান্ডে নেয়া হয়। থানা,আদালত, কারাগার ও রাজপথে দৌড়াদৌড়ি করছে করতে আমার শরীর ভেঙে পড়েছে। এদিকে
ঈদুল আজহা আসন্ন হওয়ার কারণে আমাদের পক্ষে আন্দোলন টিকিয়ে রাখা কঠিন। তাই ঈদ উপলক্ষে একটু বিরতি দেয়া দরকার।
আমিও একসময় লেখালেখি সংক্রান্ত মামলায় জেলখানায় বন্দী ছিলাম। তখন দেখতাম দুই ঈদের সময় আদালত বেশি সংখ্যক আসামি কে জামিন মঞ্জুর করে।
আমি চিন্তা করলাম এটাই মোক্ষম সুযোগ আটক নেতাকর্মীদের মুক্ত করার। তাই নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে আমরা ১২ আগস্ট শাহবাগ জাদুঘরের সামনে সমাবেশ করে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিয়ে আন্দোলন সাময়িক স্থগিত করি।এটাও ছিল আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে একটা কৌশল। আমি বিন ইয়ামিন মোল্লাকে দুইটা আল্টিমেটাম শিখিয়ে দিয়েছিলাম।
প্রথম আল্টিমেটাম- (আটক নেতাকর্মীদের ঈদের আগেই মুক্তি): ঈদুল আজহার আগেই আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি দিতে যাতে আটক নেতাকর্মীরা জেলখানা থেকে বের হয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারে। ঈদের আগে মুক্তি না দিলে জেলখানার ভিতরে আটক নেতাকর্মী এবং বাইরে আমাদের নেতা-কর্মীরা কালো পোশাক পরিধান করে ঈদ উদযাপন করবে। আমি আমাদের সহযোদ্ধা আতা ভাই কে বঙ্গবাজারে গিয়ে কালো পাঞ্জাবি কিনতে বললাম।
বিন ইয়ামিন মোল্লা আল্টিমেটাম ঘোষণা করতে গিয়ে প্রথম আল্টিমেটাম ভুলে গিয়েছিল। প্রথম আল্টিমেটাম ঘোষণা না করেই দ্বিতীয় আল্টিমেটামে চলে গেল। তাই আমি তাকে প্রথম আল্টিমেটাম স্মরণ করিয়ে দিলাম। তাই দ্বিতীয় আল্টিমেটাম ঘোষণা করার পর বিন ইয়ামিন মোল্লা প্রথম আল্টিমেটামটি ঘোষণা দিলেন।
আমাদের আল্টিমেটাম শুনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মাথা ঘুরে গেল। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “শেখ হাসিনার কাছ থেকে আল্টিমেটাম দিয়ে কোন কিছুই আদায় করা সম্ভব নয়”।
ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের তীব্র সমালোচনা করতেন । তাই আমাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের কিছু নেতার ভাষ্য ছিল ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনে জাফরুল্লাহ চৌধুরী কে সম্পৃক্ত করা যাবে না। কারণ তিনি বিএনপির সমর্থক। আমি বললাম,”তিনি কখনোই বিএনপির কোনো পদে ছিলেন না”।আমি তাদের কে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী কে আমরা কাজে লাগাতে পারি”।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সরকার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি কে মামলা হামলা চালিয়ে অপদস্থ করেছে। তাই বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী নিশ্চুপ এবং নীরব হয়ে গেছে। আমি চিন্তা করলাম এই মুহূর্তে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছাড়া আমাদের কে সহযোগিতা করার সাহস অন্য কেউ দেখাবে না। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে মোবাইলে খোলামেলা কথা বলা যায় না।তাই নিরিবিলি পরিবেশে কথা বলতে চাইলাম। তিনি আমাকে ১৫ আগস্ট সকালে তার বাসায় যেতে বললেন।
দুর্ভাগ্য বশত ১৫ আগস্ট সকালে সিরাজগঞ্জের এক অজপাড়া গাঁ থেকে আমাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেত্রী এবং ইডেন কলেজের ছাত্রী লুৎফুন্নাহার লুমা (নীলা) কে পুলিশ আটক করে।
পুলিশ তাকে আটক করার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমি মিডিয়ার মাধ্যমে নীলা কে পুলিশ আটক করার বিষয়টি খোলাসা করলাম। সেই সময় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল থেকে শুরু করে অনেকেই ‘দায়সারা’ মনোভাব দেখিয়েছেন।
আমি দেখেছি আন্দোলনের দুর্দিনে অনেকেই ছাত্রলীগ ও পুলিশের ভয়ে দূরে থাকলেও ছাত্রীদের অনেকেই সরব ছিলেন। কিন্তু নীলাকে আটকের ঘটনায় অনেকেই ভয় পেয়ে গেছেন।
আমি ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বাসা চিনতাম না।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে একজন বললেন যে,বড় ভাইয়ের বাসা ধানমন্ডি মিনাবাজারে। কিন্তু আমি মিনা বাজারে পৌঁছে বড় ভাইয়ের বাসা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একজন চায়ের দোকানদার বললেন যে ঐযে পরিত্যক্ত বাসা দেখা যাচ্ছে ঐটাই ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বাসা। বাসায় ঢুকে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী কে আন্দোলনের সর্বশেষ আপডেট জানালাম। একজন মেয়ে কে আটক করায় আন্দোলনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমি ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী কে জানালাম।
আমি বললাম নেতাকর্মীদের জামিন শুনানি ২৭ আগস্ট। কিন্তু তার আগেই ফাইল পুট আপ (File put up ) করে জামিন নেওয়া সম্ভব। ঈদের কারণে আদালত বিবেচনা করতে পারে।
ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিঃস্বার্থভাবে আমাদের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিলেন। তিনি আমার সামনেই সরকারের এক উপদেষ্টার সাথে কথা বললেন। পরেরদিন জাতীয় প্রেসক্লাবে দেখা করার কথা বললেন। পরের দিন সকালে ১৬ আগস্ট আমি আটক নেতাকর্মীদের খোঁজ খবর নিতে কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গেলাম।
নেতাদের সঙ্গে কৌশল বিনিময়ের পর পুরান ঢাকার জজ আদালতে আসলাম। কারণ সেদিন নীলাকে আদালতে হাজির করার কথা। নির্ধারিত সময়ে নীলা কে পুলিশ আদালতে হাজির না করায় আমরা ফেরত আসছিলাম। ঠিক এই সময়ে নিচে নামতেই দেখি নীলাকে পুলিশ নিয়ে আসছে। এরপর আদালতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের আইনী লড়াই শেষে তাকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হলো।
সরকারের লিঁয়াজো চলাকালীন সময়ে নীলার এই রিমান্ড আমি মানতেই পারলাম না। সেদিন আমি ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে দেখা করতে চাইলাম। তিনি বললেন যে আগামীকাল( ১৭ আগস্ট )সকালে এবং বিকালে আমাদের সমর্থনে আয়োজিত পৃথক দুটি অনুষ্ঠানে তিনি থাকবেন।
১৭ আগস্ট কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারীদের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। কারণ এই দিনে কারাগারে আটক নেতাদের মুক্তির সমর্থনে পৃথক চারটি প্রোগ্রাম হয়েছিল।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল চারটি প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকার। ১৭ আগস্ট সকালে কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন মিলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করে।এই মানববন্ধনে আটক নেতাকর্মীদের পিতা-মাতা ও পরিবারের সদস্যরাও বক্তব্য রাখেন।
ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং তার সহধর্মিণী শিরীন হক সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন।
আমরা একটি মেসেজ সেদিন সরকারকে দিতে পেরেছিলাম যে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সম্পৃক্ত কেউই সরকার বিরোধী কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত নয়। আমরা শুধু মাত্র দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করেছি । অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয় ।
আমি কিছুটা আশাবাদী হলাম। কারণ যেভাবে মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে সবাই মিলে আমাদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে,তাতে সমঝোতা না হলেও আইনী লড়াই অথবা রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মুক্তির ফায়সালা করা সম্ভব।
আমার বাড়ি কক্সবাজার। আমি একসময় এক বছরের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। আন্দোলনের জন্য চট্টগ্রাম কে প্রস্তুত করা দরকার। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের সহযোদ্ধারা গা ঢাকা দিয়েছে। তদুপরি তারা চট্টগ্রাম মহানগরের সহযোদ্ধাদের সাথে নানা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোদ্ধারা । তাই আমি চট্টগ্রামের সহযোদ্ধাদের সাথে দ্বন্দ্ব নিরসন ও চট্টগ্রামে নেতাকর্মীদের মুক্তির জন্য ১৭ আগস্ট রাতে চট্টগ্রাম শহরে চলে গেলাম। সারারাত ট্রেনে জার্নি শেষে সকালে চট্টগ্রামে পৌঁছে কিছুটা রেস্ট নিয়ে জিইসি মোড়ে সহযোদ্ধাদের সাথে মিলিত হলাম। ঐদিন চট্টগ্রাম মহানগরের সহযোদ্ধা আমির জুয়েল,আবদুল কাইয়ুম সহ চারজন এসেছিল। সেদিন চট্টগ্রামের আদালতে আরেক সহযোদ্ধা তৌহিদুল ইসলামের সাথে কথা বলেছি।
পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোদ্ধাদের সাথে কথা বলেছি। সারাদিন ক্লান্তি শেষে ১৮ আগস্ট রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত এগারোটায় হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি ঐ সময় একটু ঘুম ভাঙলেই মোবাইল চেক করতাম। কারণ আন্দোলনের দুর্দিনে ভূমিকা পালন করার কারণে কেউ না কেউ আমাকে কল দিতো।
আতা ভাই এবং সাইফুল ইসলাম ১৯ আগস্ট ‘ভুক্তভোগী’ শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের কে নিয়ে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অফিসে গেলেন।ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাদের কে নিয়ে আইনজীবীর চেম্বারে গেলেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের যেসব নেতাকর্মী ‘বিএনপিপন্থী’ বলে ডাক্তার ‘জাফরুল্লাহ চৌধুরী’ কে এড়িয়ে যেতেন, তারাই পরবর্তী সময়ে ডাক্তারের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়েছেন।
কিউএনবি/আয়শা/১১ এপ্রিল ২০২৫,/রাত ৮:৪৫