ডেস্ক নিউজ : সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশেম নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অনুসারী উদারপন্থি নেতারা সেখানে নিজেদের অবহেলিত মনে করছিলেন। সে সময় তারা মোঘলটুলির ১৫০ নম্বর বাড়িতে একটি কর্মিশিবির স্থাপন করেন। চিন্তা করেন একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন শেখ মুজিবুর রহমান।
তখন টাঙ্গাইলে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ পদত্যাগ করার কারণে শূন্য হওয়া একটি উপনির্বাচনে দুই দফায় মুসলিম লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে দেন মওলানা ভাসানী ও শামসুল হক। কিন্তু তাদের দুজনের নির্বাচনী ফলাফলই অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
তখন তারাও এসে উদারপন্থি মুসলিম কর্মীদের সঙ্গে মিলে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার কথা ভাবতে শুরু করেন। তারা একটি সভা ডাকেন। সেই সভা ডাকার প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইয়ার মোহাম্মদ খান।
কিন্তু সেই সভা করার জন্য কোনো অডিটোরিয়াম পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন কে এম দাস লেনের কাজী হুমায়ুন রশীদ তার মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে সভা করার আহ্বান জানান। সেখানেই ২৩ জুন বিকেলে আড়াইশ-তিনশ লোকের উপস্থিতিতে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রস্তাব অনুযায়ী সেই দলের নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।
সেই সঙ্গে পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’, যার সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। নতুন দল গঠনের পর মওলানা ভাসানীকে দায়িত্ব দেয়া হয় একটি নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করার জন্য। তিনি অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে কমিটি ঘোষণা করেন।
নতুন সেই কমিটির সভাপতি হলে মওলানা ভাসানী। সহসভাপতি হলেন আতাউর রহমান খান, আলী আমজাদ খান, আহমেদ আলী খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আবদুস সালাম খান। সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। ট্রেজারার করা হয় ইয়ার মোহাম্মদ খানকে। শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে থেকেই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। প্রথম কমিটি ছিল ৪০ জনের। পরদিন ২৪ জুন আরমানিটোলা ময়দানে একটি জনসভা ডাকা হয়; কিন্তু তৎকালীন মুসলিম লীগের কর্মীরা সেই সভায় হামলা করে।
বিভিন্ন তথ্যানুযায়ী রোজ গার্ডেনের সভায় কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেল ছিলেন। কিন্তু সরকারি পদে থাকার কারণে তিনি কিছুক্ষণ পরই সেখান থেকে চলে যান।
দলের নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি থাকায় পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ আপত্তি করছিলেন। এ নিয়ে দলে বেশ একটি বিরোধ তৈরি হয়েছিল, যে মুসলিম শব্দটি থাকবে নাকি থাকবে না। তখন হিন্দু এবং মুসলিম আসনে আলাদাভাবে নির্বাচন হতো। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় একটা সমঝোতা হয়েছিল যে, এই দলটি একটি অসাম্প্রদায়িক দল হবে। ওই নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পায় যুক্তফ্রন্ট, যা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল, পাকিস্তান খেলাফত পার্টি আর নেজামে ইসলামী পার্টির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ পেয়েছিল ১৪৩টি আসন।
যুক্তফ্রন্টের প্রধান তিন নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মওলানা ভাসানী দলকে অসাম্প্রদায়িক করতে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়ার জন্য জোর দিচ্ছিলেন, কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চাইছিলেন যে মুসলিম শব্দটি থাকুক। কারণ তার ভয় ছিল, এটা বাদ হলে পশ্চিম পাকিস্তানে জনপ্রিয়তা কমে যাবে।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের যে কাউন্সিল হয়, সেখানে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। তবে পূর্ব পাকিস্তান শব্দ দুটি বাদ পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর থেকে প্রবাসী সরকারের সব কাগজপত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নাম ব্যবহার হতে শুরু করে।
কিউএনবি/আয়শা/২২ জুন ২০২৪,/রাত ৯:৫৪