নিজস্ব প্রতিবেদক : বিএনপি উপজেলা নির্বাচন বর্জন করলেও কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে চলছে বিএনপির কর্মীদের ভালোবাসা বনাম নেতাদের ক্ষোভের লড়াই!বিএনপির দলীয় প্রতীক এবং দলীয় প্রার্থী না থাকলেও বিএনপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা বহিষ্কৃত নেতা শাফায়াত আজিজ রাজুর ‘ঘোড়া’ ছুটছেন এবং নেতারা বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী রুমানা আক্তারের ‘আনারস’ নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।
এবারের উপজেলা নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে আগামীকাল ২১ মে পেকুয়া উপজেলা পরিষদের চতুর্থ নির্বাচন।
বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের ‘ভালোবাসা’ নিয়ে ভোটের মাঠে ছুটছে রাজুর ‘ঘোড়া’:
এবারের পেকুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে সাবেক দুই বারের উপজেলা চেয়ারম্যান শাফায়াত আজিজ রাজুর প্রতীক ‘ঘোড়া’। তিনি বিএনপির সাবেক এমপি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মরহুম মাহমুদুল করিম চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁর বাবা মাহমুদুল করিম চৌধুরী ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে চকরিয়া এবং কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মগনামা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় হন রাজু । তিনি ২০০৩ সালে পেকুয়া উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ছিলেন জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি পদেও। সেই সময় পেকুয়া উপজেলা বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলে নিজস্ব বলয় তৈরি করতে সক্ষম হন তিনি। সেই ২০০৬ সালের অক্টোবরে উপজেলা যুবদলের সম্মেলন শেষে তাকে সভাপতি পদের বিপরীতে সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত করলে তার সমর্থকরা প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সেই থেকেই রাজনৈতিক মনোমালিন্য শুরু।
তখন উপজেলা ছাত্রদলের ‘সভাপতি’ পদ নিয়ে ছাত্রদল নেতা মনোহর আলম বাদশাহ এবং ইউসুফ রুবেলের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি এবং যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ রাজুকে উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণের পর পেকুয়ার অধিকাংশ বিএনপির নেতাকর্মীরা ‘ঢাকা’ দেন।
নেতারা পলাতক থাকলেও ২০০৮ সালের উপজেলা নির্বাচনকে সামনে রেখে পেকুয়ার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন শাফায়াত আজিজ রাজু। ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে পেকুয়ার পাড়া -মহল্লায় গণ জোয়ার তৈরি করেছিলেন তিনি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এর সহধর্মিণী হাসিনা আহমেদ বিজয়ী হওয়ার পর ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য পেকুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কে সামনে রেখে শাফায়াত আজিজ রাজুকে উপজেলা বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেন উপজেলা বিএনপি। ফলে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি পেকুয়া উপজেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে বিজয়ী হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন রাজু। সরকার বিরোধী আন্দোলনেও অগ্রভাগে ছিলেন তিনি ।
২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয় বার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তখন তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়াহিদুর রহমান ওয়ারেছীর দ্বিগুণ ভোট পেয়েছিলেন। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০ দলীয় জোটের মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমেদকে ‘গুম’ করা হলে রাজু পেকুয়ায় তাঁর সন্ধানের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। দুইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পেকুয়ার মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোন অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না।
বিএনপি দলীয় এবং জোট গত ভাবে নির্বাচন বর্জন করায় ২০১৯ সালের পেকুয়া পরিষদের তৃতীয় নির্বাচনের তিনি অংশগ্রহণ করেননি। বিভিন্ন সময় রাজুকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে মূল্যায়ন না করায় তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। ফলে দলে সক্রিয় ছিলেন না। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ‘পাঠাও চালক’ হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিত হন তিনি। দুই বারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রাজু চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে বিকম পাস করলেও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার কারণে ব্যবসায় জড়িত ছিলেন না। অবশেষে ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম শহরের চকবাজারে ব্যবসা বাণিজ্যে সক্রিয় হন। তবে দলের সাধারণ কর্মী এবং সমর্থকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল।
এবারের নির্বাচনে শাফায়াত আজিজ রাজু প্রার্থী হচ্ছেন জেনে তাকে ‘ঠেকাতে’ উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাহাদুর শাহ গত ২২ এপ্রিল একটি কমিউনিটি সেন্টারে রীতিমতো মিটিং ডেকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা দেন।চেয়ারম্যান পদে পেকুয়া উপজেলা যুবদলের সভাপতি কামরান জাদিদ মুকুট, ভাইস চেয়ারম্যান পদে পেকুয়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আহসান উল্লাহ এবং নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আবছারের স্ত্রী রাজিয়া বেগমকে বিএনপির একক প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের এলাকায় দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের এমন ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন প্রার্থীরা।
পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সদস্য রাজু দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করায় দল থেকে বহিষ্কারও হয়েছেন। কিন্তু দলের নেতারা তাকে বহিষ্কার করলেও দলের কর্মীরা তাকে ‘আগলে’ রেখেছেন নির্বাচনের মাঠে। দলের সাধারণ কর্মী এবং সমর্থকরা নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করেই শাফায়াত আজিজ রাজুর জন্য পাড়া- মহল্লায় গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। বিভিন্ন সময়ে রাজপথে থাকা উপজেলার ত্যাগী ও পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা শাফায়াত আজিজ রাজুর পক্ষে মাঠে নেমেছেন।
পেকুয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন বিজয় জানান,”পেকুয়ার রাজনীতিতে শাফায়াত আজিজ রাজুর তুলনা কারো সাথে হয় না। একজন পরিচ্ছন্ন নেতা,রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান এবং দুইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে গেছেন। আগামী ২১ মে উপজেলা নির্বাচনে জনগণ আবারও রাজু ভাই কে নির্বাচিত
করবে”।
রাজু কে ঠেকাতে জাহাঙ্গীর আলমের সহধর্মিণী রুমানা আক্তারের ‘আনারস’ নিয়ে ভোটারদের কাছে নেতারা:
সাধারণ কর্মী এবং সমর্থকরা রাজুর নির্বাচনী প্রতীক ‘ঘোড়া’ নিয়ে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান নিলেও পেকুয়া উপজেলা বিএনপির নেতারা বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের সহধর্মিণী রুমানা আক্তারের নির্বাচনের মাঠে হাওয়া তুলেছেন। কারণ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে নির্বাসিত সালাহউদ্দিন আহমেদের অনুপস্থিতিতে পেকুয়া উপজেলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু শাফায়াত আজিজ রাজু। তাই তাঁকে যে কোন মূল্যে ঠেকাতে জাহাঙ্গীর আলমের সহধর্মিণী রুমানা আক্তারের ‘আনারস’ নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন বিএনপির নেতারা।
জাহাঙ্গীর আলম ১৯৯৭ সালে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডের মেম্বার ছিলেন। ২০০৫ সালে উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।২০০৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হলেও তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গড়ে তুলতে পারেন নি। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থন থেকে বঞ্চিত হন। ২০১৯ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় বিএনপি’র প্রার্থীরা নৌকার মাঝি আবুল কাশেম কে ঠেকাতে জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে কাজ করেন। মূলত বিএনপি অধ্যুষিত পেকুয়ার ‘এন্টি আওয়ামী লীগ’ ভোটে বিজয়ী হন জাহাঙ্গীর আলম। অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়ার কারণে উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে পারেন নি তিনি। এবারের নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী রুমানা আক্তার মনোনয়নপত্র জমা দেন।স্বামী জাহাঙ্গীর আলমের প্রার্থিতা বাতিল হলে স্ত্রী রুমানা আক্তার এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী করছেন।
একমাত্র নারী প্রার্থী রুমানা আক্তারের পরিচয় বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী। পেশায় তিনি একজন গৃহিণী এবং স্ব-শিক্ষিত। পেকুয়া উপজেলার গণমানুষের কাছে পরিচিত মুখ না হওয়ায় নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কঠিন হবে মনে করছেন পেকুয়া উপজেলার সাধারণ ভোটাররা।
এই বিষয়ে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই,চেয়ারম্যান প্রার্থী রুমানা আক্তারের আনারস প্রতীকের নির্বাচনী এজেন্ট ও সাবেক ছাত্রনেতা ওসমান সারোয়ার বাপ্পী জানান,”ঝড় ,তুফান এবং বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমরা নির্বাচনী মাঠে আছি ।জনগণ আমাদের পক্ষে রায় দেবে” ।
কিউএনবি/আয়শা/২০ মে ২০২৪,/রাত ৯:৫৬