এম এ রহিম, চৌগাছা, (যশোর) : যশোরের চৌগাছায় অসহায় খেজুর গাছি সলিম মন্ডলের খোঁজ রাখেন না কেউ !। গ্রামের শীতের সকাল মানেই অন্য রকম আবহ। শীতের রকমারি পিঠাপুলির উৎসব। শীতের সকালে একটু খেজুর রস না হলে যেন চলেই না। সেই রসের আবর্তে অনেকের জীবন জীবিকা আটকে আছে খেজুর গাছেই। দিনের বড় একটা অংশ খেজুর গাছেই কাটে তাদের। গাছ থেকে গাছে উঠে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করাই তাদের কাজ। আর আঞ্চলিক ভাষায় এদেরকে বলা হয় গাছি ।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার ভগবানপুর গ্রামের সলিম মন্ডল হলেন তেমনি একজন গাছি । বয়স পেরিয়ে গেছে ৬০ এর কোটা। প্রায় দুই যুগ ধরে গাছ কাটা পেশার সাথে যুক্ত রয়েছেন তিনি । এ বছরে গ্রামের বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে চুক্তি ভিত্তিক ১শ ২০ টি খেজুর গাছ বর্গা নিয়েছেন। খেজুর গাছ থেকে যে আয় হয় তাতেই সারা বছর চলে তার ৫ সদস্যের সংসার।
গতকাল কুয়াশাচ্ছন্ন এক সকালে সলিম মন্ডলের সঙ্গে দেখা হয় উপজেলার ভগবানপুর গ্রামের মাঠে। বয়সেরভারে ন্যুজ শরীর! কঠোর পরিশ্রম আর জীবন যুদ্ধের দুশ্চিন্তায় ভেঙে গেছে দেহ। গ্রামের অন্য গাছিদের সাথে কথা বলতে দেখে এগিয়ে এলেন তিনি। তার দিকে তাকাতেই বলতে থাকেন নানা রকম অভিযোগের কথা। পুরাতন পাতলা রংচটা সোয়েটার পরার কারনে তার রোদে পোড়া শরীরটা যেন আরও ¯পষ্ট হয়ে উঠেছে। কনকনে শীতের সকালেও হাস্যজ্জল সলিম মন্ডলের মুখটা। মনটাও সাদা। সরল মনে বলতে থাকেন জীবনের সব কথা।
পেশায় বর্গা গাছি । অতিকষ্টে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি মাঠে এসেছেন খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য। তার গাছের কাছে যেতে হয় ফসলের ভিতর দিয়ে। ফসলের আইল ধরে হাটতে থাকি। সলিম মন্ডল সামনে আমরা (সংবাদকর্মীরা) পেছনে। আশপাশে চোখে পড়ে মরিচ ক্ষেত, সরিষা ক্ষেতসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেত। কুয়াশা ভেজা ফসলের ভিতরে অন্য গাছিরাও গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন।
তার গাছের নিকটে পৌঁছে রস সংগ্রহের ফাঁকে ফাঁকে বলতে থাকেন- খুব গরিব ঘরে জন্ম নিয়েছেন তিনি। বাবা আমির মন্ডলও একজন বর্গা চাষী ছিলেন। অনেক আগেই মারা গেছেন বাবা আমির মন্ডল। বাবার কাছ থেকে আট শতক ভিটেবাড়ির জমি ছাড়া আর কিছুই পাননি। ছোট থেকে অবহেলা আর অনাদরে বড় হয়েছেন। যে কারনে স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। এখন দুই মেয়ে ও এক ছেলের বাবা সলিম মন্ডল। ছেলে মেয়ে সকলকেই বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে ছেলে ও ছেলের বৌসহ পরিবারে মোট ৫ সদস্য।
প্রতি বছরের মতো এ বছরও অন্যের কাছ থেকে ১শ২০ টি খেজুর গাছ বর্গা নিয়েছেন। গাছগুলো একাই রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করেছেন। ছয় ভাগে প্রতিদিন ২০ টি করে গাছ কাটতে হয় সলিম মন্ডলের। গাছ থেকে রস সংগ্রহের ঠিলে (ভাঁড়) ধোয়া, গাছ কাটা, বিকেলে ঠিলে বদলানো, সকালের রস সংগ্রহ এবং সেই রস থেকে গুড় তৈরি করতে সারাদিন হাঁড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয় তাকে।
সলিম মন্ডল জানান ১ টি খেজুর গাছ প্রায় ৩ মাস কাটলে ৮/১০ কেজি মতো গুড় উৎপাদন করা যায়। সে হিসেবে ১শ ২০ টি খেজুর গাছ থেকে প্রায় ১ হাজার থেকে ১২শ কেজি গুড় উৎপাদন হবে। এর থেকে সলিম মন্ডলকে ২শ কেজি গুড় গাছের মালিকদের দিতে হবে। বাকি ৮শ থেকে ১ হাজার কেজি গুড় পাবেন তিনি। যার বর্তমান স্থানীয় বাজার মূল্য প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। খেজুর গাছ কাটা পেশাটা মৌসুমী পেশা। তাই সলিম মন্ডলের তিন মাসের এই আয় দিয়েই চলতে হয় বছরের বাকি ৯ মাস।
কথা বলার সময় সলিম মন্ডল অভিযোগ করে বলেন, আমি গরিব মানুষ। শুনেছি সরকার গাছিদের অনেক কিছুই দিচ্ছেন। আমি এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো অনুদান পাইনি। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন গাছিদের অনেক কিছুই দিয়েছেন। কিন্তু আমার এলাকায় যারা গাছি না তারাও সেই অনুদান পেয়েছেন। কিন্তু আমি কিছুই পাইনি। দেশ অনেক এগিয়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনিভাবে অনেক অন্ধকার ঘরে এখনও আলো জ্বলেনি এটাও সত্য। কবে কখন সলিম মন্ডলের ঘরে জ্বলবে সুখের বাতি তার খবর কেউ রাখেনা।
কিউএনবি/আয়শা/০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪,/সন্ধ্যা ৬:১৪