সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ০১:২২ পূর্বাহ্ন

দরিদ্র পরিবার থেকে যেভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছিলেন খামেনি

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬
  • ২৬ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আয়াতুল্লাহ খামেনির বিভিন্ন স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, তার মা খাদিজে মির্দামাদী কোরআন তেলাওয়াতের কণ্ঠ খুব ভালো ছিল। তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে, শৈশবে তার চরিত্র গঠনে মায়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খবর বিবিসি’র।

খামেনির বয়স যখন চার বছর, তখন বড় ভাই মোহাম্মদের সঙ্গে তিনি স্থানীয় একটি মক্তবে যাওয়া শুরু করেন। নিজের স্মৃতিকথায় খামেনি বলেছেন, তিনি মক্তবের শিক্ষককে ভয় পেতেন।
 
জানা যায়, খামেনির শৈশব কেটেছে অভাবের সংসারে। দারিদ্র্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন যে, ছোটবেলায় তাকে ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মাঝে মধ্যেই ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হতো। এছাড়া মলিন ও পুরোনো পোশাকের জন্য শৈশবে খামেনিকে তার মাদ্রাসার সহপাঠীরা প্রায়ই কটাক্ষ করতো। এ নিয়ে মাঝেমধ্যে তাদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদও লেগে যেতো। 
 
স্মৃতিকথায় মি. খামেনি উল্লেখ করেছেন যে, ছোটবেলায় তার একজোড়া ‘ফিতাওয়ালা জুতা’র খুব শখ ছিল। মক্তবের পর স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন আলী খামেনি। যদিও তার বাবা সৈয়দ জওয়াদ খামেনি পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধিতা করতেন।
 
ছোট থেকেই আলী খামেনি চোখে কম দেখতেন। দুর্বল দৃষ্টিশক্তির কারণে তিনি শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ড ও শিক্ষকদের ঠিকমত দেখতে পেতেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিষয়টি কেউ ধরতে পারেনি। ফলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া পর্যন্ত তাকে ‘ভীষণ বোকা ও অলস ছাত্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হতো।
 
দুর্বল দৃষ্টিশক্তির বিষয়টি ধরা পড়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে খামেনি চশমা ব্যবহার শুরু করেন। এরপর তিনি লেখাপড়ায় নিজের উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে বিদ্যালয়ের শীর্ষ মেধাবী শিক্ষার্থীদের একজন হয়ে ওঠেন।
 
তবে বাবার বিরোধিতার মুখে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি আলী খামেনি। তখন ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তাকে শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে পাঠানো হয়। স্মৃতিকথায় আলী খামেনি বলেছেন, কৈশোরে সাহিত্যের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ জন্মেছিল, বিশেষত উপন্যাস ও কবিতার প্রতি। পরবর্তীতে তিনি কবিদের বিভিন্ন সভা ও কবিতার আসরে যোগ দিতে শুরু করেন। 
 
সাহিত্যের প্রতি অনুরোগ এতটাই বেশি ছিল যে, কোমে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার আগেই তিনি এক হাজারেরও বেশি উপন্যাস পড়ে ফেলেছিলেন বলে স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন। সেসব উপন্যাসের মধ্যে লিও টলস্টয়, ভিক্টর হুগো এবং রোমা রোলার মতো বিখ্যাত লেখকদের বইও ছিল। যৌবনে আলী খামেনি ‘আমিন’ ছদ্মনামে কবিতাও লেখা শুরু করেন।
 
ছাত্র থাকাকালে খামেনি ১৯৫৫ সালে কোমে একটি সভায় যোগ দেন। সেখানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সঙ্গে তার দেখা হয়, যার নেতৃত্বে পরে ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। কোমে পড়াশোনা করার সময় আলী খামেনি ইরানের তৎকালীন শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধাচরণ শুরু করেন। ১৯৬২ সালে তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন।
 
এরপর তরুণ আলী খামেনি ধীরে ধীরে খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। মৃত্যুর আগে বিভিন্ন স্মৃতিকথায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি জীবনে যা কিছু শিখেছেন এবং যা বিশ্বাস করেন, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত।
 
শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়েছিলেন আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন। বিপ্লবের আগ পর্যন্ত আলী খামেনির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মূলত মাশহাদ শহরকেন্দ্রিক ছিল। এরপর ১৯৭৭ সালে তিনি সপরিবারে তেহরানে চলে যান।
 
একই বছরের ডিসেম্বরে গ্রেফতার এড়াতে আলী খামেনি ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বৃহত্তম প্রদেশ সিস্তান ও বেলচিস্তানে চলে যান। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি পুনরায় তেহরানে ফিরে আসেন। সেসময় বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পান আলী খামেনি। 
 
পরবর্তীতে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীরকে সংগঠিত করতে সহায়তাও করেন। এই বিপ্লবী গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
 
১৯৮১ সালের জুন মাসে, তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। তার ওপর ওই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল দেশটির বামপন্থি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। এই ঘটনায় তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দুই মাস পর, একই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে।
 
রাজাইয়ের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আট বছর ধরে আনুষ্ঠানিক এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। ওই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নানা মতবিরোধে জড়ান। কারণ তিনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানের ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সংস্কার আনতে চাইছেন।
 
১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (ধর্মীয় আলেমদের একটি পরিষদ) আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। যদিও তিনি সংবিধানে নির্ধারিত শিয়া ধর্মগুরুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদমর্যাদা বা ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ উপাধি অর্জন করতে পারেননি।
 
পরে ইরানের সংবিধানে সংশোধন আনা হয়। সংশোধনীনে বলা হয়েছিল, সর্বোচ্চ নেতাকে ‘ইসলামী পাণ্ডিত্য’ অর্জন করতে হবে এবং আলী খামেনি নির্বাচিত হতে পারবেন। পরে রাতারাতি তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়েছিল। ইরানের সংবিধানে তখন আরও একটি পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং প্রেসিডেন্টের হাতে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়।
 
ইরানের সংবিধানও পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে প্রেসিডেন্টের হাতে বৃহত্তর কর্তৃত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল। নিজের শাসনামলে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ছয়জন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন। যাদের অনেকেই খামেনির কর্তৃত্বকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেননি।
 
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের হামলায় নিহত হন।
 
সূত্র: বিবিসি

 

 

কিউএনবি/আয়শা/০১ মার্চ ২০২৬,/রাত ১১:৫৪

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

March 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit