আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রাজ্যাভিষেকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে আরোহণ করেছেন যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লস। এর মাধ্যমে রাজপরিবারে প্রতীকীভাবে নতুন যুগের সূচনা হলো। ব্রিটেনের স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে ক্যান্টাবারির আর্চবিশপের নেতৃত্বে রাজ্যাভিষেকের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। রাজ্যাভিষেকে শপথ গ্রহণের পর রাজা চার্লসকে রাজমুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। পরে রানি ক্যামিলাকেও মুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজা তৃতীয় চার্লসের এ অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। ডেইলি মেইল, বিবিসি, স্কাই নিউজ।
ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবি রাজার মাথায় সেইন্ট এডওয়ার্ড মুকুট পরিয়ে দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘ঈশ্বর রাজাকে রক্ষা করুন।’ জীবনে একবারই রাজা এই মুকুট পরার সুযোগ পাবেন। ঘণ্টাখানেকের জন্য তিনি মুকুটটি পরে ছিলেন।
মুকুট পরিয়ে দেওয়ার পর শুরু হয় রাজার সিংহাসনে আরোহণের পর্ব। ক্যান্টারবারি ও ইয়র্কের আর্চবিশপ এবং তাদের সহকারীরা রাজাকে সিংহাসনের দিকে নিয়ে যান। এরপর সিংহাসনে বসেন রাজা তৃতীয় চার্লস। এটি হচ্ছে রাজ্যাভিষেকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সর্বশেষ ১৯৫৩ সালে নিজের রাজ্যাভিষেকে সেইন্ট এডওয়ার্ড মুকুটটি পরেছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। এবার ৭০ বছর পর তার ছেলে চার্লস নিজের রাজ্যাভিষেকে এ মুকুট পরলেন।
এর আগে যুক্তরাজ্যের রাজতন্ত্রের ৪০তম সিংহাসন আরোহী হিসাবে শপথ নেন চার্লস। ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। আর্চবিশপ বলেন, আমরা এখানে রাজাকে মুকুট পরাতে সমবেত হয়েছি এবং সেবা করার জন্যই আমরা রাজাকে মুকুট পরাই। রাজা তৃতীয় চার্লস পবিত্র গসপেলে হাত রেখে শপথ নেন। এ সময় তিনি আইনের শাসন ও চার্চ অব ইংল্যান্ডের মর্যাদা সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া একজন ‘একনিষ্ঠ প্রটেস্ট্যান্ট’ হিসাবে দ্বিতীয় শপথও নেন রাজা তৃতীয় চার্লস। এরপর আর্চবিশপ আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজা চার্লসকে মুকুট পরিয়ে দেন। এ সময় সবাই সমবেত কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘গড সেভ দ্য কিং’। মুকুট পরানোর এ সময়কে স্মরণীয় করে রাখতে ঠিক দুপুর ১২টা ০১ মিনিটে যুক্তরাজ্যজুড়ে ‘গান স্যালুট’ দেওয়া হয়।
মুকুট পরানোর পরপরই রাজা চার্লসের বড় ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম প্রথম প্রথা ভেঙে হাঁটু গেড়ে বসে নতুন রাজাকে শ্রদ্ধা জানান। তিনি বাবার প্রতি আজ্ঞাবহ থাকার অঙ্গীকার করে বলেন, আমি উইলিয়াম, প্রিন্স অব ওয়েলস আপনার প্রতি বিশ্বস্ত থাকার প্রতিজ্ঞা করছি। ঈশ্বর আমায় সহায়তা করুন। এরপর তিনি উঠে দাঁড়ান এবং মুকুট স্পর্শ করে রাজার গালে চুমো দেন। আবেগাপ্লুত রাজা চার্লস এ সময় সামনে এগিয়ে আসেন এবং বলেন, ‘আমিন’। উইলিয়াম তোমাকে ধন্যবাদ। এর মিনিট খানেক পরই রানি ক্যামিলাকে মুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় অভিষেকের সংগীত বেজে ওঠে এবং রানি আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে বসেন। এবারের রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠান যতটা সম্ভব বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাবে আয়োজন করা হয়েছে। আগের যে কোনো অভিষেক অনুষ্ঠানের তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশি ধর্মীয় বিশ্বাসের উপস্থিতি রাখা হয়েছে। অনুষ্ঠানে ইসলাম, ইহুদি, বৌদ্ধ এবং শিখ ধর্মের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বাইবেল থেকে পাঠ করেন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক, যার ধর্ম হিন্দু। অনুষ্ঠানে ওয়েলস, স্কটিশ ও আইরিশ ভাষায় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
হাজার বছর ধরে চলা এই অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রথমবার কোনো নারী বিশপ অংশ নেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় ব্রিটিশ সময় আনুমানিক দুপুর ১টায়। এরপর রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলা গোল্ড স্টেট কোচ নামের চার টনি স্বর্ণখচিত ঘোড়ার গাড়িতে বাকিংহাম প্যালেসে ফেরত যান। প্রায় ১ মাইল পথ (১.৬ কিমি.) এই শোভাযাত্রায় তাদের সঙ্গে ছিল আনুষ্ঠানিক পোশাক পরা ৩৯টি দেশের চার হাজার সামরিক সদস্য এবং ১৯টি ব্যান্ড দল। এ সময় রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ তাদের রাজা-রানিকে শুভেচ্ছা জানান।
হাজার হাজার উৎসুক জনতা এবং সমর্থকদের শুভেচ্ছা জানাতে বিকালে বাকিংহাম প্রাসাদের বারান্দায় রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে সাক্ষাৎ দিয়েছেন রাজা চার্লস এবং রানি ক্যামিলা। রাজা-রানিকে দেখেই জনসাধারণ ‘গড সেভ দ্য কিং’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। রাজা এবং রানি জনসাধারণের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। রাজা চার্লস এবং রানি ক্যামিলার সঙ্গে এ সময় প্রিন্স উইলিয়াম, প্রিন্সেস অব ওয়েলস, তাদের সন্তান, এডিনবার্গের ডিউক এবং ডাচেস এবং প্রিন্সেস অ্যান যোগ দিয়েছিলেন।
তবে এখানে রাজা চার্লসের ছোট ছেলে প্রিন্স হ্যারিকে দেখা যায়নি। তিনি বাকিংহাম প্রাসাদে না এসে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্রিটেনে ২৪ ঘণ্টা অবস্থানের পর তিনি সরাসরি হিথ্রো বিমানবন্দরে চলে যান। শনিবারই তিনি ছেলে আর্চির চতুর্থ জন্মদিনে যোগ দিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে গেছেন।
লন্ডনে শনিবার সকালে বৃষ্টি হয়েছে। তবে তাতে রাজার অভিষেক অনুষ্ঠান ঘিরে মানুষের উৎসাহে কোনো ঘাটতি পড়েনি। সকালে রাজা চার্লস এবং কুইন কনসোর্ট ক্যামিলাকে নিয়ে শোভাযাত্রা যখন বাকিংহাম প্রাসাদ থেকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে যাচ্ছিল, তখন হাজার হাজার মানুষ রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাদের এক নজর দেখার জন্য।
রাজা চার্লসের রাজ্যাভিষেকে যোগ দিতে দেশ-বিদেশের নেতা ও তারকারাও ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে জড়ো হন। বিশ্বের প্রায় ১০০ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিশ্বের গণ্যমান্য ব্যক্তি এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে চার্লস যুক্তরাজ্য এবং আরও ১৫টি দেশের রাজা হন। শনিবার আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করলেন।
কিউএনবি/অনিমা/০৭ মে ২০২৩,/সকাল ১১:১৯