ডেস্ক নিউজ : সেদিনের সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো শ্রমিকদের স্বজনেরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি, তেমনি যথাযথ সহায়তা না পাওয়ায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অনেক শ্রমিক ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। তাই হতাহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও দোষীদের বিচার দাবিতে প্রতিবছরই এই দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন সংগঠন।
রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর দেয়া অভিযোগপত্রের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রানা প্লাজা ভবনের তৃতীয় তলায় পিলার ও দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। তখন বিজিএমইএর কর্মকর্তারা ভবন পরিদর্শন শেষে ভবন ব্যবহার বন্ধ রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু পাঁচ পোশাক কারখানার মালিক, ভবনমালিক ও তাদের লোকজন শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেন। এরপরেই ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
জানা যায়, রানা প্লাজা একটি বাণিজ্যিক ভবন হলেও এর ভূগর্ভস্থ তলায় গাড়ি রাখার জায়গা, প্রথম তলায় ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, দ্বিতীয় তলায় বিপণিকেন্দ্র এবং তৃতীয় থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত পোশাক কারখানা ছিল। এর ওপরের দুটি তলা খালি ছিল। ঘটনার দিন সকালে মার্কেটের বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ থাকলেও, খোলা ছিল তৈরি পোশাক কারখানা।
ফলে দুর্ঘটনায় ইট-কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মুহূর্তেই হারিয়ে যায় হাজারেরও বেশি তাজা প্রাণ। আবার সৌভাগ্যক্রমে শত শত পোশাক শ্রমিক প্রাণে বেঁচে যান; কিন্তু তাদের বেশিরভাগকেই পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়।
দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত এবং ১ হাজার ১১৭ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও ১৯ জন। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৬ জনে। আহত হন ১ হাজার ৫২৪ জন। ২৯১টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা ছাড়াই ঢাকার জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে ১৫৭টি লাশের পরিচয় শনাক্ত সম্ভব হয়েছে।
মামলায় অগ্রগতি তেমন নেই
এদিকে, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত ভবনের মালিক রানা, তার পরিবার, সাভার পৌরসভার তৎকালীন মেয়রসহ বিভিন্ন জনের নামে পাঁচটি মামলা হয়। এরমধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে একটি, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) একটি এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিনটি মামলা দায়ের করে। ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট সম্পদের হিসাব দাখিল না করা সংক্রান্ত নন সাবমিশন মামলায় রানার তিন বছর কারাদণ্ড হয়। এ মামলায় তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
২০১৮ সালের ২৯ মার্চ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলায় রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার মা মর্জিনা বেগমের ছয় বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড হয়। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তার ৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬৬ হাজার ৯৯০ টাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন আদালত।
এছাড়া ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের আরেকটি মামলা চলমান আছে। তবে ভবন ধসের ঘটনায় মূল মামলার বিচারে অগ্রগতি নেই।
২০১৬ সালে ১৮ জুলাই হওয়া মূল মামলাযর বিচার শুরু হয়। এদিন ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন। তবে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে দীর্ঘদিন আটকে ছিল বিচারকাজ। পরে ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার আদালতে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। আগামী ১৪ মে মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। এখন পর্যন্ত মামলার ৫৯৪ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৩৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।
এর আগে, ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে রানার বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। রানা প্লাজা ধস হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ৪১ আসামির মধ্যে বর্তমানে কারাগারে আছেন কেবল ভবনের মালিক সোহেল রানা। বাকি আসামিদের মধ্যে জামিনে আছেন ৩২ জন, পলাতক ছয়জন এবং মারা গেছেন দুইজন।
কেমন আছেন বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা
রানা প্লাজা ধসের আট বছর পূর্তিতে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের এক জরিপে বলা হয়, দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের ৫১ শতাংশ ২০১৯ সালে বেকার ছিলেন। ২০২০ সালে করোনাকালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ শতাংশ, যা আগের ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরমধ্যে আহত পোশাক শ্রমিকদের সাড়ে ৯ শতাংশের কোনো আয় নেই। আর সাড়ে ১০ শতাংশের আয় ৫ হাজার ৩০০ টাকার নিচে।
জরিপের ফলাফলে আরও বলা হয়, রানা প্লাজা ধসে আহত শ্রমিকদের মধ্যে ৯২ শতাংশই করোনাকালে সরকারের কোনো সহায়তা পাননি। মাত্র ৮ শতাংশ শ্রমিক অল্প কিছু সহায়তা পান। এছাড়া ১৪ শতাংশ শ্রমিকের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। সাড়ে ১২ শতাংশ শ্রমিক মানসিক ট্রমার মধ্যে আছেন। ২০১৯ সালেও এই সংখ্যা ছিল সাড়ে ১০ শতাংশ। এর মানে ২ শতাংশ শ্রমিকের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে।
ওই প্রতিবেদন প্রাকাশের দুই বছর পরেও শ্রমিকদের অবস্থার পরিবর্তন নেই। বিচার না পাওয়ার পাশাপাশি যথার্থ সহায়তা না পাওয়ায় বেশরিভাগ শ্রমিক এখনও দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
কিউএনবি/আয়শা/২৩ এপ্রিল ২০২৩,/রাত ৮:৫০