বাদল আহাম্মদ খান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা পরিষদে ঢুকে নির্বাহী অফিসারের বাংলোতে যেতে রাস্তাটি এখনো পাকাপোক্ত। বুধবার দুপুরে সরজমিনে দিয়ে দেখা গেছে, নুন্যতম কোনো ধরণের সমস্যা নেই শ’খানেক গজের রাস্তাটিতে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) এর আওতায় এ সড়ক মেরামতে আট লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কাগজপত্র বলছে, ইতিমধ্যেই এখানে কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পরিষদের সামনের দিকের একটি ভবনে (ইউএনও অফিসের পাশে) অফিস করেন। তার জন্য নির্ধারিত ভবনে সরকারি অন্যান্য অফিস। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ভবন মেরামতের নামেও বরাদ্দ আসে আট লাখ, যেটিরও কাগুজে বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার দুপুর নাগাদ ওই ভবন মেরামতের কোনো আলামত চোখে পড়েনি। এভাবে মোট ৫৬ লাখ টাকার কাগুজে বাস্তবায়ন হয়েছে উন্নয়ন কাজের। ইতিমধ্যেই কাজের টাকা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না। কাগুজে প্রক্রিয়ায় যেন কেউ ত্রæটি ধরতে সেজন্য নতুন নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিষয়টি জানাজানি হচ্ছে আন্দাজ করতে পেরে কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ‘কোটেশন’ আহবান করে উপজেলা পরিষদের দেওয়ালে নোটিশ টানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কাজই করা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছর আখাউড়ায় এডিপি’র এক কোটি ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এর মধ্যে সম্প্রতি ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে। এর আগের কাজগুলোর অধিকাংশ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় না গিয়ে কোটেশনের মাধ্যমে ঠিকাদার বাছাই কাজ করা হয়। সর্বশেষ বরাদ্দের ক্ষেত্রেও এটি করা হয়। পরিষদের একজন জনপ্রতিনিধি অন্য আরেক জনপ্রতিনিধি নির্দেশে ঠিকাদার বাছাই করে দেন। বিধি অনুযায়ি কার্য ও ভৌত সেবা ক্রয়ের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে ১০ লাখ ও বছরে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকার অধিক কোটেশনের মাধ্যমে খরচ করা যাবে না। বিধি অনুযায়ি কোটেশন আহবানের ক্ষেত্রে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশের প্রয়োজন না থাকলেও নূন্যতম প্রচারে নোটিশ বোর্ডসহ ওয়েব সাইটে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, উপজেলা পরিষদের এক জনপ্রতিনিধি প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিয়েছেন। অন্য এক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির নির্দেশে তিনি এ কাজ করেন। প্রত্যেক ইউনিয়নের পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ২৫ লাখ ও অন্যান্য কাজে মোট ৩১ লাখ টাকার কাজের ক্ষেত্রে এক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দু’টি কাজও দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের এক চেয়ারম্যান বলেন, ‘অর্থ বরাদ্দ যেন ফিরে না যায় সে কারণে কাজ শেষ হয়েছে মর্মে দেখিয়ে টাকা উঠিয়ে ফেলা হয়েছে বলে শুনেছি। যদিও টাকাগুলো ঠিকাদারদের অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি। তবে এক্ষেত্রে কাজ না করার কোনো সুযোগ নেই। হয়তো নিয়মের কিছু ব্যাঘাত ঘটবে।’
উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যন মো. মুরাদ হোসেন বলেন, ‘কোটেশন প্রক্রিয়ায় যেসব ঠিকাদার নিয়মিত কাজ করেন তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ি ঠিকাদার বাছাই করা হয়েছে। আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করা যাবে।’ কাজের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও কাজ না করেই টাকা উত্তোলনের বিষয়ে তিনি সদুত্তর না দিয়ে দেখা করে কথা বলবেন বলে জানান। এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম সুমন কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। মঙ্গলবার বিকেলে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ভালো বলতে পারবেন বলে উল্লেখ করেন।
আখাউড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেম ভূইয়া বলেন, ‘আমি অনেক অসুস্থ। ঢাকায় আছি। কিডনী ডায়োলসিস হচ্ছে। এ অবস্থায়ও আমি একদিন অফিসে গেলে এসব কাজ সম্পর্কে জানানো হয় সব ঠিকঠাক আছে। আমার পক্ষে গিয়ে কাজ দেখা সম্ভব ছিলো না। তাই আমি এমনিতেই স্বাক্ষর দিয়ে দিয়েছি। কাজের কি অবস্থা সেটাও আমি জানি না।’উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অংগ্যজাই মারমা বলেন, ‘ঈদের পর কাজ শুরু হওয়ার কথা বলে জানি।’ তাহলে কাজ শেষ না করে টাকা কিভাবে তুললেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ব্যস্ততা আছে জানিয়ে সাক্ষাতে কথা বলবেন উল্লেখ করেন এবং তড়িঘড়ি করে মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দেন।
কিউএনবি/আয়শা/২২ জুলাই ২০২২, খ্রিস্টাব্দ/বিকাল ৩:০৮