বাংলাদেশের তথাকথিত বাম রাজনীতিবিদ ও তাদের দুর্নীতি
———————————————————————-
সমাজতন্ত্রের কথা, সমাজ বদলের কথা, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের কথা, ক্ষেত মজুরদের কথা, ভূমিহীন, সহায় সম্বলহীন মানুষের কথা এক সময় আমাদের দেশের বাম রাজনীতিবিদদের মুখে খৈ ফুটতো। মাইকে ভাষণ দেয়ার সময় মুখের ফেনা বের করে ফেলত। শাসক গোষ্ঠীর তখতে তাউস ভেঙ্গে গুড়িয়ে চুরমার করে ফেলত তারা।
এই সকল বাম রাজনীতিবিদদের পচন শুরু হয়েছিল ৭০ দশকেই। মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়া আমাদের পক্ষে অবস্থান নেয়, সার্বিক সহযোগিতাও করে। রাশিয়ার এই ভূমিকায় স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট উচ্চাঙ্গ সংগীত আমরা ভালোই উপভোগ করেছি। কি মস্কো, আর কি পিকিং পন্থী ? সকল বাম রাজনীতিবিদদের হাম্বরী ভাব কে নাই দেখে ?
৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্বাসন, দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা সহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক খাতে উন্নয়নে সহায়ক শক্তি হিসাবে এদেশে বহু আন্তর্জাতিক বেসরকারী সংস্থা কাজ শুরু করে। এরমধ্যে তখন পিএল ৪৮০, কেয়ার, আরডিআরএস, ব্র্যাক সহ বিভিন্ন এনজিও কার্যক্রমে বামরা নেতৃত্ব দেয়া শুরু করল। বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীরা দলে দলে এনজিওতে চাকুরী নেয়া শুরু করে। পরবর্তীতে এরাই নিজের পরিবার, আত্নীয় স্বজনদেরকে নিয়ে গড়ে তুলে হাজারো এনজিও।
এরশাদ আমলে অনেক বাম রাজনীতিবিদ ক্ষমতার স্বাদ নিতে শুরু করলেন। এরশাদ সরকারের বৈধতা দেয়া এবং তার ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার পিছনে বাংলাদেশের বাম রাজনীতিবিদদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। বাম রাজনীতিবিদ কাজী জাফর আহমেদ এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বনে যান। আবার জাসদের আ স ম আব্দুর রব অথবা বাসদের জিয়াউদ্দিন বাবলুদের কথা কে না জানে ?
বিএনপি সরকারের আমলেও কমিউনিস্টরা আদর্শের বুলি ভুলে গিয়ে কম তেলবাজি করেনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচিকে এই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ওয়ালারাইরা সমর্থন জানিয়েছিল। দলে দলে বামরা যোগদেন বিএনপিতে। এদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব পর্যন্ত হতে পেরেছেন আব্দুল মান্নান ভুইয়া ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির সৃষ্টি লগ্নে ছিল বামদের প্রাধান্য। মূলত ন্যাপ থেকেই মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বে হাজার হাজার নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দেন।
৯৬ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বাম রাজনীতিবিদদের আসল চেহারা বেরিয়ে আসল। অগ্নি কন্যাখ্যাত বেগম মতিয়া চৌধুরী মন্ত্রী হলেন। আ স ম আব্দুর রব ও মন্ত্রী হলেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের ধারাবাহিক সরকার পরিচালনায় আমরা দেখতে পেলাম সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়াকে, জাসদের হাসানুল হক ইনুকে, ওয়াকার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, কমিউনিস্ট পার্টির নুরুল ইসলাম নাহিদকে মন্ত্রী হিসাবে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা বনে যান নূহ আলম লেনিন। ক্ষমতাধর লেফটিস্টদেরকে আমরা যেভাবে আবিষ্কার করলাম তা শুধু ইতিহাস।
বাংলাদেশের বাম রাজনীতিবিদরা সারাজীবন স্লোগান দিয়েছে ”দুনিয়ার মজদুর এক হও” । কিন্তু দুর্ভাগ্য, কোন মজদুরকেই তারা এক করেনি। বরং তাদের মাথায় বেল ভাঙ্গিয়ে মজা করে খেয়েছে। ক্ষেত মজুরদের স্বার্থের কথা বলে নিজেরা ফায়দা লুটেছে। ভূমিহীনদের জমিদানের কথা বলে নিজেরাই জমি বরাদ্দ নিয়েছে, লিজ নিয়েছে। অভাগারা অভাগাই থেকে গেছে।
বাংলাদেশের বাম রাজনীতিবিদরা ভাত খেয়েছে এদেশের, গান গেয়েছে রুশ ভারতের। আজ তাদের সকল সংগীত থেমে গেছে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসী আক্রমণে। সকল বামরা নিশ্চুপ। কারও মুখে রা নেই। ইউক্রেনে মানবতা লংঘিত হচ্ছে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ, বৃদ্ধাকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। সোনাফলা একদেশ ইউক্রেনকে বিরানভূমিতে পরিণত করা হচ্ছে। এদের মানবতাবোধটা দলীয় ছাতার নিচে ঢাকা পরে আছে।
এদেশে বাম রাজনীতির কোন ভবিষ্যৎ নেই। সাইনবোর্ড সর্বস্ব বামদল গুলো মতিঝিল কেন্দ্রিক চাঁদাবাজি আর হালুয়া রুটির ভাগ নেয়া ছাড়া তাদের এই দেশে কোন প্রাপ্তি জুটবেনা। কারণ এদেশের মানুষ তাদের চিনে ফেলেছে।
লেখকঃ লুৎফর রহমান, রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট।
১৭.০৫.২০২২ ইং রাত ১২.১৮