ডেস্ক নিউজ : অনেকেই মনে করেন, নফল ইবাদত কেবল অতিরিক্ত কিছু আমল, যা না করলেও ফরজ তো আদায় হয়েই যায়! কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও নৈকট্য অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো এই নফল ইবাদত। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলার ঘোষণাটি এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
وَلَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا
‘…বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয়পাত্র বানিয়ে নিই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে।’ (বুখারি ৬৫০২)
সাহাবায়ে কেরাম নফল ইবাদতের এই গভীর মর্যাদা ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তারা নিয়মিত আমলের মাধ্যমে নিজেদের জীবন আলোকিত করতেন। তাদের সেই চমৎকার আমল ও প্রিয়নবী (সা.)-এর সুন্নাহর আলোকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত নিচে তুলে ধরা হলো—
১. রাতের নীরবতার ইবাদত: তাহাজ্জুদ নামাজ
দিনের ব্যস্ততা শেষে রাতের শেষ ভাগে ঘুম থেকে উঠে মালিকের দরবারে দাঁড়িয়ে যাওয়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। প্রিয়নবী (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এই নামাজের প্রতি ছিলেন ভীষণ যত্নবান। একটি চমৎকার ঘটনার মধ্য দিয়ে তার এই নিষ্ঠা ফুটে ওঠে। একবার তিনি এক স্বপ্নের কথা নিজ বোন হাফসা (রা.)-কে জানান। হাফসা (রা.) বিষয়টি নবীজিকে (সা.) জানালে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—
نِعْمَ الرَّجُلُ عَبْدُ اللَّهِ، لَوْ كَانَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ
‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ! যদি সে রাতে নামাজ আদায় করত!’ (বুখারি ৩৭৩৮, ৩৭৩৯)
এরপর থেকে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) রাতের সামান্য সময়ই ঘুমানোর অভ্যাস করেছিলেন এবং বাকি সময় তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দিতেন।
২. দিনের শুরুতে চাশত বা দোহার নামাজ
সূর্য ওঠার কিছু সময় পর থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত আদায় করা হয় চাশতের নামাজ। এটি এমন এক নফল ইবাদত, যা রিজিক ও হৃদয়ে প্রশান্তি আনে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন—
أَوْصَانِي خَلِيلِي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثٍ: صِيَامِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَرَكْعَتَيِ الضُّحَى، وَأَنْ أُوْتِرَ قَبْلَ أَنْ أَنَامَ
‘আমার প্রিয় বন্ধু রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে তিনটি বিষয়ে অসিয়ত করেছেন— প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা, দুই রাকাত চাশত বা দোহার নামাজ আদায় করা এবং ঘুমানোর আগে বিতর নামাজ পড়া।’ (বুখারি ১৯৪১, মুসলিম ৭২১)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) আমৃত্যু এই অসিয়তগুলোর ওপর আমল অব্যাহত রেখেছিলেন।
৩. প্রতি মাসে তিন দিন নফল রোজা
রমজানের বাইরেও নফল রোজার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা সাহাবিদের নিয়মিত অভ্যাস ছিল। হজরত আবু দারদা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে প্রতি মাসে অন্তত তিন দিন রোজা রাখার অসিয়ত করেছিলেন। (মুসলিম, ৭২২)
৪. বিশেষ দিনের রোজা: আরাফা ও আশুরা
সারা বছরের বিশেষ কিছু দিনে নফল রোজা রাখার সওয়াব অনেক বেশি। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ، وَصِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
‘আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি এর মাধ্যমে আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন। আর আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আশা করি, এর মাধ্যমে আগের এক বছরের গুনাহ মাফ করবেন।’ (মুসলিম ১১৬২)
৫. কুরআন তেলাওয়াতে হৃদয়ের প্রশান্তি
সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক নিবিড় রাখতেন। তারা প্রতিদিন তেলাওয়াতের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ঠিক করে নিতেন এবং তা নিয়মিত আদায় করতেন। অনেক সাহাবি প্রতি সাত দিনে একবার পুরো কুরআন খতম করতেন।
হজরত আয়েশা (রা.) মাঝে মধ্যে বিছানায় শুয়েও নিজের নিয়মিত তেলাওয়াতের অংশটুকু শেষ করতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা ৩০৮০৮)
বর্ণিত রয়েছে, এক রাতে হজরত উসমান (রা.) মাকামে ইবরাহিমের সামনে দাঁড়িয়ে ফজর পর্যন্ত মাত্র এক রাকাতেই পুরো কুরআন খতম করেছিলেন। (ফাযায়েলে কুরআন, আবু উবায়দ ১/৩৫১; নাতায়েজুল আফকার ৩/১৬০-১৬১)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-ও প্রতি সাত দিনে কুরআন খতম করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন। (নাতায়েজুল আফকার: ১/১৪৯)
৬. নিয়মিত জিকির ও তাসবিহ
চলতি পথে, কাজের ফাঁকে বা অবসর সময়ে জিকিরের মাধ্যমে নিজের জিহ্বাকে সজীব রাখা ছিল সাহাবিদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ قَالَ: سُبحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، فِي يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ، حُطَّتْ خَطَايَاهُ وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ
‘যে ব্যক্তি প্রতিদিন একশত বার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ পাঠ করবে, তার গুনাহসমূহ সমুদ্রের ফেনার মতো হলেও ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি ৬৪০৫)
অন্য এক হাদিসে হজরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَحَبُّ الْكَلَامِ إِلَى اللَّهِ أَرْبَعٌ: سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، لَا يَضُرُّكَ بِأَيِّهِنَّ بَدَأْتَ
‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কালাম বা বাণী চারটি— ‘সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আল্লাহু আকবার।’ এগুলোর যে কোনোটি দিয়ে তুমি শুরু কর, তাতে কোনো ক্ষতি নেই।’ (মুসলিম ৫৪১৬)
ধারাবাহিক আমলের অপরিসীম গুরুত্ব
নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। একসঙ্গে অনেক আমল শুরু করে কিছুদিন পর তা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে অল্প হলেও নিয়মিত আমল করা আল্লাহর কাছে বেশি পছন্দনীয়।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো— ‘আল্লাহর কাছে কোন আমল সর্বাধিক প্রিয়?’ তিনি উত্তর দিলেন—
أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ
‘যে আমল নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়।’ (বুখারি ৬৪৬৫)
সাহাবিদের বর্ণাঢ্য ও আলোকময় জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। বড় বড় নফল ইবাদতের বোঝা ঘাড়ে না নিয়ে বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ছোট আমলকে অভ্যাসে পরিণত করা বুদ্ধিমানের কাজ। ফরজ ইবাদতগুলো নিখুঁতভাবে আদায় করার পাশাপাশি নিয়মিত নফল আমলগুলোর চর্চা করুন। এই ছোট্ট অভ্যাসই একদিন বান্দাকে পৌঁছে দেবে তার রবের ভালোবাসার পরম ঠিকানায়।
কিউএনবি/আয়শা/০৫ নভেম্বর ২০২৬,/রাত ৯:৪৪