আন্তর্জাতিক ডেস্ক : হিমালয়ের শীতের সঙ্গে লড়াই করতে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের গুরেজ উপত্যকার কৃষকরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের উৎপাদিত আলু মাটির নিচে বিশেষ গর্তে সংরক্ষণ করে আসছেন। তবে আধুনিকতার ছোঁয়া ও সময়ের বিবর্তনে এই প্রাচীন প্রথাটি আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। এর ফলে কেবল খাবার সংরক্ষণের একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিই বিপন্ন হচ্ছে না বরং স্থানীয় আলুর বিভিন্ন দেশি প্রজাতি এবং সেগুলো সংরক্ষণ ও বাছাইয়ের আদি জ্ঞানও চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
গুরেরজের এক দূরবর্তী পাহাড়ি গ্রাম চোরওয়ানের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী হাজরা বেগম। নিজের পরিবারের ক্ষেতে দীর্ঘ দিন আলু তোলার পর তিনি ফসলগুলো ভালো করে পরীক্ষা করছেন। আলুর গায়ে কোনো কাটা দাগ, নরম অংশ কিংবা পচা ভাব আছে কি না, তা খুব সতর্কতার সঙ্গে দেখছেন। শীতের কঠিন মাসগুলোতে পরিবারের খাবারের জোগান দিতে এবং আগামী বসন্ত মৌসুমে রোপণ করার জন্য বীজ হিসেবে এগুলোকে আলাদা করা হচ্ছে।
হাজরা বেগমের মতে, বীজ হিসেবে যে আলু রাখা হবে, তা একদম নিখুঁত হতে হবে। আপনি যদি একটি খারাপ আলু রেখে দেন, তবে আপনার সামনের পুরো একটা বছর নষ্ট হয়ে যাবে।
শীতকাল আসার আগেই হাজরা বেগম একটি ‘খ্রাও’ প্রস্তুত করছেন। এটি মূলত ঐতিহ্যবাহী এক ধরনের ভূগর্ভস্থ আলু সংরক্ষণের গর্ত, যা খড় দিয়ে মোড়ানো থাকে এবং হিমালয়ের হাড়কাঁপানো ঠান্ডার হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করতে শক্ত করে সিল করা হয়। হিমালয়ের এই শীত এতটাই নির্মম হয় যে, যখন প্রচণ্ড তুষারপাতে কাশ্মীরের মূল উপত্যকার সঙ্গে এসব গ্রামের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসে। এই তীব্র ঠান্ডায় পাইপ ফেটে যায় এবং ডিজেল পর্যন্ত জমে বরফ হয়ে যায়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাটি আজ কোণঠাসা। যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাটের উন্নতি হওয়ায় এবং তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় আগের মতো আর কেউ এই মাটির নিচের গর্তগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করছে না।
হাজরা বেগম ছোটবেলায় দেখেছেন, প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই তিন বা চারটি করে এমন গর্ত থাকত। কিন্তু বর্তমানে নিচের মূল উপত্যকায় মানুষ এই প্রথা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন কেবল গুটিকয়েক পরিবার এই পদ্ধতি ধরে রেখেছে। বাকিরা বাজার থেকে আলু কিনে খায় কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে।
কীভাবে ভালো আলু চিনে রাখতে হয়, যা পচে যায় না বা দ্রুত অঙ্কুরোদ্গম হয় না, তা হাজরা বেগম শিখেছিলেন তার মায়ের কাছ থেকে। এখন তিনি এই জ্ঞান নিজের মেয়েকেও শিখিয়ে দিচ্ছেন, তবে এই ঐতিহ্য ও দক্ষতা পরবর্তী প্রজন্মে আদৌ টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে তিনি যথেষ্ট সন্দিহান।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সংবেদনশীল নিয়ন্ত্রণ রেখার (লাইন অব কন্ট্রোল) কাছেই অবস্থিত এই উচ্চ উচ্চতার হিমালয়ান উপত্যকা গুরেজ। শ্রীনগর থেকে প্রায় ৮০ মাইল বা ১২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই উপত্যকাটি প্রতি বছর শীতে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যখন এর প্রধান সড়ক সংযোগ রাজদান পাস প্রায় ৩৬০০ মিটার উচ্চতায় তুষারাবৃত হয়ে বন্ধ থাকে।
এই অঞ্চলটি ‘দার্দ-শিন’ নামক একটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাসস্থান। তারা শিনা ভাষায় কথা বলেন এবং কাশ্মীরের মূল সংস্কৃতির চেয়ে এদের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলেও তাদের সামাজিক যোগাযোগ রয়েছে।
ভারতের কৃষিসংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চের ন্যাশনাল ব্যুরো অব প্ল্যান্ট জেনেটিক রিসোর্সেস’ (আইসিএআর-এনবিপিআর)-এর ২০১৯ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, গুরেরজের মোট কৃষিজমির প্রায় ৪৫ শতাংশ জুড়েই আলুর চাষ হয়। অথচ এই উপত্যকায় উৎপাদিত আলুর জিনগত বৈচিত্র্য বা জীববৈচিত্র্য আজও সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি।
আইসিএআর-এনবিপিআর-এর শ্রীনগর স্টেশনের এক জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. শেখ এম সুলতান এই উপত্যকা জরিপ করার সময় অতীতে দেখা অনেক প্রজাতির আলু আর খুঁজে পাননি। তিনি বলেন, যখন আমি প্রথম এখানে এসেছিলাম, তখন অনেক ধরনের আলুর দেখা পেয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর মধ্য থেকে একটি নমুনাও খুঁজে পাওয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জিনগত বৈচিত্র্যের এই ক্ষতি অপূরণীয়।
ড. সুলতান জানান, মানুষের স্থানান্তর, উন্নত রাস্তাঘাট এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলেই এই অবনতি ঘটেছে। যখন মানুষ নিজের উৎপাদিত বীজ তৈরি করা বন্ধ করে দেয় এবং সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক প্রজাতির ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তখন সেই ক্ষতি আর পুষিয়ে নেওয়া যায় না। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন যে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত প্রজাতিগুলোর চেয়ে বহিরাগত প্রজাতিগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেয়, অথচ দেশীয় ফসলগুলোর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এখনও খুব কমই জানা আছে। আমাদের এই আদিপ্রজাতির আলুর মধ্যে তীব্র ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট কিছু কীটপতঙ্গ ও রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতার মতো মূল্যবান বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। এই বিষয়গুলো অবহেলা না করে আমাদের আরও গভীরভাবে গবেষণা ও মানোন্নয়ন করা উচিত।
এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয় অঞ্চলের কৃষকদের সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। গুরেরজের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন যে, বসন্তকাল এখন আগের চেয়ে শুষ্ক হয়ে গেছে, তুষারপাত কমেছে এবং তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে আলু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চোরওয়ানের ৭০ বছর বয়সী কৃষক আব্দুল জব্বার মাপনূ অতীতের তুষারাবৃত শীতের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, প্রতিটি বাড়িতে দুই বা তিনটি করে ‘খ্রাও’ থাকত এবং প্রতিটিতে প্রায় পাঁচ কুইন্টাল অর্থাৎ ৫০০ কেজি করে আলু রাখা যেত। কিন্তু এখন ঝরনাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, শীতকালে তুষারপাতও আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। ফলে আলুর ফলনও হ্রাস পেয়েছে। আমার এখনো মনে আছে, অতীতে জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে পুরো উপত্যকা ছয় ফুট বরফের চাদরে ঢাকা থাকত।
কৃষিকাজ যখন ক্রমান্বয়ে আরও কঠিন হয়ে পড়ছে এবং বাজারে প্রবেশ সহজ হচ্ছে, তখন কৃষকদের নিজেদের উৎপাদনে আগ্রহও কমে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার আগেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের চেষ্টায় স্থানীয় আবহাওয়ার উপযোগী হয়ে ওঠা এই প্রজাতিগুলো চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
কাশ্মীরের ‘শের-ই-কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি’-র বিজ্ঞানী ড. পারভীন কুমার মনে করেন, স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত প্রজাতিগুলোকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কৃষকদের অভিযোজন কৌশল সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
কৃষিজমির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এই উপত্যকার কৃষির জন্য আরেকটি বড় হুমকি। গুরেরজে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ এমনিতেই বেশ কম, তার ওপর ‘কিশানগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প’-এর কারণে জমি অধিগ্রহণ ও তলিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় উপত্যকার কৃষিভূমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এই এলাকাগুলোর মধ্যে বাদওয়ান গ্রামও রয়েছে, যা মূলত আলুর জন্য সুপরিচিত।
এই প্রজাতিগুলোকে সংরক্ষণের একটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারে ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ ব্যবহার করা। এটি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত একটি বিশেষ স্বীকৃতি, যা ফরাসি ‘অ্যাপেলেশন ডি অরিজিন কন্ট্রোলে’র অনুরূপ। যেসব পণ্যের একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক উৎপত্তি রয়েছে এবং যার গুণগত মান বা সুনাম সেই উৎসের সঙ্গেই বিশেষভাবে সম্পৃক্ত, কেবল তাদের জন্যই এই স্বীকৃতি ব্যবহার করা যায়। এটি পণ্যের বাজারমূল্য বাড়াতে এবং বৃহত্তর স্বীকৃতি অর্জনে সাহায্য করতে পারে। কাশ্মীরের পাম্পোরের জাফরান চাষের ক্ষেত্রে এই ধরনের কর্মসূচি এবং বিশ্ব কৃষিজ ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থা কর্মসূচি বেশ সফল ভূমিকা পালন করেছে।
তবে কেবল স্বীকৃতিই এই প্রজাতিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। এগুলো চাষের বাইরে হারিয়ে যাওয়ার আগেই বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিহ্নিত ও নথিভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি, কোন আলু কীভাবে নির্বাচন করতে হবে, কীভাবে সংরক্ষণ ও পুনরায় রোপণ করতে হবে; সে বিষয়ে কৃষকদের যে বংশপরম্পরায় চলে আসা জ্ঞান রয়েছে, তা রক্ষা করাও সমানভাবে জরুরি।
চোরওয়ানে হাজরা বেগম আলুর শেষ বস্তাটি গর্তে নামিয়ে তা ঢেকে দিচ্ছেন, আরেকটি দীর্ঘ শীত পার করার জন্য সবকিছু প্রস্তুত করছেন। এর কিছু অংশ দিয়ে তার পরিবারের পেট চলবে, আর বাকি অংশটুকু আগামী বসন্তে আবার জমিতে রোপণ করা হবে। কোন আলু খাওয়া উচিত আর কোনটিকে বীজ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা দরকার, এই পুরো বিষয়টি নির্ভর করে শত শত বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা পারিবারিক ও দেশীয় জ্ঞানের ওপর।
এই প্রজাতিগুলো যখন এখনো চাষ করা হচ্ছে, তখনই যদি এগুলো যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা না হয়, তবে বিজ্ঞানীরা এর অন্তর্নিহিত রহস্য বা বৈচিত্র্য পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই কাশ্মীর তার একটি জীবন্ত কৃষিসম্পদ চিরতরে হারিয়ে ফেলতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কিউএনবি/অনিমা/০৪ নভেম্বর ২০২৬,/বিকাল ৫:৫৪