আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইয়েমেনে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হুতিদের গোপনে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত দেশটি সরাসরি সৌদি আরবের বিরোধী পক্ষকে সহায়তা করছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট নিউজ।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাত-সমর্থিত ইয়েমেনি সামরিক গোষ্ঠীগুলো হুতিদের লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করছে। এমনকি আমিরাতের পক্ষ থেকেও সরাসরি গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আমিরাতের সঙ্গে হুতিদের যোগাযোগের একটি গোপন চ্যানেল এখনো সক্রিয় রয়েছে। ইয়েমেনের একজন সূত্রের দাবি, সানা-ভিত্তিক প্রশাসনের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য পাঠিয়েছে আবুধাবি। আমিরাত-সমর্থিত সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগের নিজস্ব ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে হুতিরা। তবে এই সহায়তা মূলত ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সৌদি আরবের ভেতরে হামলার জন্য গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমিরাতের এই গোপন তৎপরতার বিষয়ে অবগত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। সম্প্রতি এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা আবুধাবিকে সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন বিষয়টি জানতে পেরেছে এবং এ ধরনের সহায়তা বন্ধ করা উচিত। তবে সূত্রগুলোর দাবি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতি এই সমীকরণকে আরও জটিল করেছে। গত মাসে ইরান-সমর্থিত আনসারুল্লাহ বাহিনী লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত সামরিক অভিযান চালিয়ে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বাণিজ্যপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যায়। এরপর থেকে সৌদি আরব সানা ও হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালাচ্ছে। পাল্টা জবাবে সৌদি ভূখণ্ডেও হামলা চালিয়েছে হুতিরা।
আমিরাতের এই অবস্থানের পেছনে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে দুই দেশ একসঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে অংশ নেয়। তবে যুদ্ধের লক্ষ্য ও রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে শুরু থেকেই তাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। আমিরাত মূলত দক্ষিণ ইয়েমেনে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম ব্রাদারহুড-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি ইস্লাহ পার্টিকে দুর্বল করার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ লক্ষ্যেই ২০১৭ সালে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) গঠনে সহায়তা করে দেশটি।
গত বছরের ডিসেম্বরে আমিরাত-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। সৌদি আরবের সামরিক অভিযানের মুখে আমিরাতকে ইয়েমেন থেকে সরে যেতে হয়। ফলে দেশটির প্রভাবিত অনেক সামরিক ইউনিট এখনো সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বিত হয়নি।
তবে আমিরাতের পক্ষ থেকে হুতিদের সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। এসটিসির প্রতিনিধি আমর আল-বাইধ জানিয়েছেন, তাদের বাহিনীর হুতিদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। অন্যদিকে আনসারুল্লাহর জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলেছেন, আমিরাত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে।
এদিকে, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট থেকে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় ইয়েমেনে আড়াই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তায়েজ অঞ্চলে ছয় লাখের বেশি মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব ও আমিরাতের স্বার্থের সংঘাত ইয়েমেনের যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলছে। এর ফলে শুধু আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নয়, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সূত্র : ড্রপ সাইট নিউজ
কিউএনবি/অনিমা/৩১ অক্টোবর ২০২৬,/সকাল ৬:৩০