আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মাঝ-আকাশে সহ-পাইলটের ভয়াবহ এবং প্রাণঘাতী আক্রমণের মুখে পড়েও অসীম সাহসিকতা, ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্ত ও বীরত্বের মাধ্যমে যাত্রীদের জীবন রক্ষা করায় ফ্লাইদুবাইয়ের ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ‘বিশ্বনায়ক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। শনিবার স্মিত মাচ্ছারকে সরাসরি টেলিফোন করে তার শারীরিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন এবং এই বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য ইসরায়েল, ভারতসহ পুরো বিশ্বের পক্ষ থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ইসরায়েলের আসন্ন স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান।
ফোনালাপে এই ঐতিহাসিক আমন্ত্রণের কথা উল্লেখ করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী জানান যে, দেশের স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী ‘টর্চ’ বা শিখা প্রজ্বালনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করতে চান তিনি। নেতানিয়াহু ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে উদ্দেশ করে বলেন, এই সম্মান সচরাচর কেবল ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্যই সংরক্ষিত থাকে। তবে এই বিশেষ ঘটনার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রতিটি নাগরিক তাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে ও সানন্দে গ্রহণ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের ‘এফজেড১০৭৩’ ফ্লাইটে এই নজিরবিহীন ও রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। বিমানের ওমানি সহ-পাইলট হামাম আল-হামামি ককপিটে থাকা কুড়াল বা ড্রেস মেকিং এযাক্স দিয়ে হঠাৎ করেই মূল পাইলট স্মিত মাচ্ছারের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। আক্রমণকারী সহ-পাইলটের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণহীন করে ধ্বংস করে ফেলা। রক্তক্ষয়ী এই হামলার পর বিমানটি মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে ১৭,০০০ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে আসে এবং আন্তর্জাতিক জরুরি সংকেত হ্যাক বার্তা প্রেরিত হয়।
শরীরে মারাত্মক আঘাত পাওয়া সত্ত্বেও রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যাপ্টেন মাচ্ছার নিজের শেষ শক্তি দিয়ে ককপিটের ডিজিটাল লক খুলে দিতে সক্ষম হন। দরজা খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানের অন্য সতর্ক যাত্রীরা ভেতরে প্রবেশ করেন, হামলাকারী ওমানি সহ-পাইলটকে ধরে ফেলেন এবং তাকে পরাস্ত করে পুরো বিমানের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেন। ফলে মাঝ-আকাশে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান বিমানে থাকা শত শত যাত্রী ও ক্রু সদস্য।
টেলিফোন সংলাপে নেতানিয়াহু ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের কাছে ঠিক কীভাবে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিলেন তা জানতে চান। ঘটনার বিবরণ দিয়ে স্মিত মাচ্ছার জানান, সহ-পাইলট নামাজের কথা বলে তার আসন থেকে উঠেছিলেন। তিনি যখন অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলেন, ঠিক তখনই হঠাৎ মাথার পেছনের অংশে প্রচণ্ড একটি আঘাত অনুভব করেন। শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন বিমানে কোনো বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। কিন্তু এরপর যখন একের পর এক আঘাত আসতে থাকে, তখন তিনি বুঝতে পারেন সমস্যা বিমানে নয়, ককপিটে থাকা তার সহকর্মীই তার ওপর হামলা চালাচ্ছে। তিনি তাকে থামানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলেও প্রাথমিক আঘাতগুলোর কারণে তার দৃষ্টিশক্তি প্রায় ঝাপসা হয়ে এসেছিল।
ক্যাপ্টেন মাচ্ছার আরও জানান, তিনি প্রথমবার দরজা খোলার চেষ্টা করলে আক্রমণকারী সহ-পাইলট তা আবার বন্ধ করে দেয়। তবে তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, এটিই তার শেষ লড়াই এবং এই মুহূর্তে দরজা খুলতে না পারলে তার নিশ্চিত মৃত্যু ঘটবে। সেই চরম মুহূর্তে নিজের ভেতরে থাকা শেষ বিন্দু শক্তি একত্র করে তিনি সবকিছুকে পেছনে ঠেলে দরজার দিকে যান এবং তা খুলে দিতে সক্ষম হন।
ভারতীয় পাইলটের আত্মত্যাগ ও অসামান্য সহনশীলতার গল্প শুনে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। নেতানিয়াহু বলেন, চরম অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও যে সাহসিকতা ও ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা স্মিত দেখিয়েছেন, তা সত্যি বিস্ময়কর। অগণিত মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি ক্যাপ্টেন মাচ্ছার ও তার পরিবারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানান এবং দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
উল্লেখ্য, এর আগে এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন যে, আহত পাইলট, সাধারণ যাত্রী এবং বিমানের অন্যান্য ক্রু সদস্যদের সময়োচিত সাহসী পদক্ষেপের কারণেই মাঝ-আকাশে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া ৯/১১-এর মতো আরও একটি ভয়াবহ মানবসৃষ্ট দুর্যোগ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
কিউএনবি/অনিমা/০৪ অক্টোবর ২০২৬,/সকাল ১০:০৫