বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪০ অপরাহ্ন

জলবায়ু পরিবর্তন ও কিয়ামতের আলামত

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২০ Time View

ডেস্ক নিউজ : মহাজগত ও বিশ্বপরিমণ্ডলের সবকিছু মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন। আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, আলো-বাতাস, সাগর-মহাসাগর, বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, জীবজন্তু-প্রাণীকুল, গাছপালা, জিনপরী, ইনসান সবকিছুই এক মহাপরিক্রমশালী ও সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তাআলার অপার সৃষ্টি। তিনি এত সবকিছু এক বিশেষ উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছেন। ওই সুনির্দিষ্ট সময় ও মেয়াদ পূরণ হলে ওই মহাজগতসহ সবকিছু তারই নির্দেশে নিমিষে ধ্বংস হয়ে যাবে। মুহূর্তে কিয়ামত সংঘটিত হবে। 

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ওই বিষয়ে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। মোট কথা মহান আল্লাহ তাআলার নির্দেশে যেমন বিশ্বপরিমণ্ডল সৃষ্টি হয়েছে, আবার তারই নির্দেশে সবকিছু ধ্বংস হবে। কিয়ামত সংঘটিত হবে। গোটা মানবজাতি যখন এক আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দেবে, পাপাচারে লিপ্ত হবে, আল্লাহর নাফরমানিতে সীমালঙ্ঘন করবে তখনই আল্লাহ তাআলা পৃথিবীকে মানুষের বাস অনুপযুক্ত করে দেবেন এবং একপর্যায়ে তারই নির্দেশে মহাপ্রলয় তথা কিয়ামত সংঘটিত হবে। এটাই একজন মুমিন মুসলমানের সহজ সরল ঈমান ও বিশ্বাস।

সবকিছুই মহান আল্লাহ তাআলার হুকুম ও নির্দেশে হবে। কিন্তু তারপরও মহান আল্লাহ তাআলা তার নিজের সকল কার্যক্রমে অর্থাৎ সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্যে বস্তুগত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও উপকরণ সুপ্ত রেখেছেন। পৃথিবী যত আধুনিক ও উন্নত হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির রহস্য ও ধ্বংস বা কিয়ামতের বস্তুগত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও উপকরণ তত উন্মোচিত হচ্ছে। পৃথিবী ও মহাবিশ্ব যে একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে, কিয়ামত যে একদিন সংঘটিত হবে, তা বস্তুবাদী বিজ্ঞানীরা এত দিন বিশ্বাস করতে চায়নি, মানতে রাজি হয়নি। তবে এখন ওইসব বাস্তববাদী বিজ্ঞানীরা পৃথিবী ও মহাবিশ্ব খুব শীঘ্রই ধ্বংস হয়ে যাবে বলে ব্যাপক আলোচনা শুরু করেছেন। তারাই ওই ধ্বংস ও কিয়ামতের বস্তুগত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করছেন। 

আধুনিক গবেষক ও বিজ্ঞানীরা পৃথিবী ধ্বংস ও কিয়ামতের বস্তুগত কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণকে উপস্থাপন করেছেন। যা মূলত কোরআন-হাদিস ও ইসলামের আলোকে কিয়ামতের আলামত ও পূর্বাভাস। যা শুধু বস্তুজ্ঞান দিয়ে অনুভব করা যায় না। যা অনুভব ও অনুধাবন করতে ঐশী জ্ঞান তথা কোরআন-হাদিসের জ্ঞান এবং ঈমানী বোধশক্তি প্রয়োজন।

পরিবেশ মানুষ বাঁচার উপাদান। সুস্থ প্রাণীর জন্য প্রয়োজন সুস্থ পরিবেশ। অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয় (বাসস্থান) ও স্বাস্থ্যসেবা (চিকিৎসা) মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। আর এগুলোর সব কিছুর জন্যেই মানুষ কোনো না কোনোভাবে পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। সুস্থ পরিবেশ মানবসভ্যতার জন্য অপরিহার্য বিষয়। সুতরাং পরিবেশ দূষিত হলে বা পরিবেশ বিপর্যয় ঘটলে পৃথিবীতে নানাবিধ সংকট ও সমস্যা দেখা দেবে। 

ধীরে ধীরে এসব সমস্যা ঘনীভূত হয়ে বিশ্বপরিমণ্ডল মানুষ বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। মানবসভ্যতা ও পৃথিবী এভাবে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। আধুনিকতা ও বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার অনিবার্য ফল হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ। যান্ত্রিক ও কারিগরির চূড়ান্ত উন্নতির অত্যাবশ্যকীয় পরিণতি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়। যান্ত্রিক সভ্যতার চরম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ সংকট। 

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন যে, এভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষিত হতে থাকলে অচিরেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। সহসাই কিয়ামত সংঘটিত হবে। সম্প্রতি নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বানের তোড় যার জ্বলজ্বন্ত উদাহরণ। অস্তিত্বের তাগিদে মানুষ আজ জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা উত্তরণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সোচ্চার হচ্ছে। গড়ে উঠছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশবাদী ও পরিবেশ সংরক্ষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। আবিষ্কৃত হচ্ছে পরিবেশ দূষণমুক্তির বিভিন্ন উপায়, পদ্ধতি। প্রচারিত হচ্ছে পরিবেশ সংরক্ষণের মুখরোচক বিভিন্ন স্লোগান। তবুও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না; বরং অবস্থা অবনতির দিকেই ধাবমান বেশি।

সম্প্রতি ২৬ আগস্ট ২০২৬-এ হিমালয় পাহাড়ে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্কারী বানের তোড়ে পাহাড়, মাটি ও পানির ধ্বংসযজ্ঞ গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে প্রায় ১৪০০-এর বেশি মানুষ মারা যায় এবং ৬০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ হয়। নেপালের ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডির পরে গোটা বিশ্ব এ নিয়ে হুলস্থুল শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এই ভয়াবহ ধস ও ঢলের মূল কারণ উদঘাটনে ইতিমধ্যেই গবেষণা শুরু করেছেন।

গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হিমালয় অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলের শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সীমারেখা প্রতি দশকে ৩২০ ফুটের বেশি উচ্চতায় উঠে যাচ্ছে। এর ফলে আগে যেসব উচ্চতায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকত, সেসব এলাকায় উষ্ণতা বাড়ছে বলে জানা গেছে। নেপালের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা বরফ, শিলা, বালু ও মাটির স্তর উষ্ণতার কারণে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হয়। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাফ্রস্ট গলে গেলে শিলার দৃঢ়তা কমে এবং পর্বতের ঢালের ভেতরে পানি প্রবেশের সুযোগ বাড়ে। এতে ঢাল ধসের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইমার্জিলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বরফে জমাট থাকা স্তর গলে গেলে শিলার শক্তি কমে এবং ঢালের ভেতরে পানি প্রবেশের সম্ভাবনা বাড়ে। এই প্রক্রিয়া পাহাড়ের স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে সংকুচিত হচ্ছে হিমবাহ, বাড়ছে ঝুঁকি। শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, হিমবাহের পরিবর্তনও বিপর্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। 

গবেষণা অনুযায়ী, লাংটাং-লিরুং হিমবাহ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে পাতলা ও সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। হিমবাহের সংকোচনের ফলে শিলার ফাটলে গলিত পানি প্রবেশ করতে পারে। এতে পর্বতের ঢালের স্থিতিশীলতা কমে গিয়ে ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনে পরিবেশের যে বিপর্যয় ঘটে তাতে পৃথিবীর উষ্ণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার দরুন পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু এবং হিমালয়ের কোটি কোটি বছরের হিমবাহগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি গলতে শুরু করেছে। এসব কারণে ইতিপূর্বে এন্টার্কটিকার হিমবাহে ব্যাপক ধস ও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। এবার হিমালয়ে বড় ধরনের ধস দেখা গেল। পরিবেশ আল্লাহর সৃষ্ট রহস্যাবৃত নেয়ামতসমূহের অন্যতম। জীব ও জড় উপাদানসমূহের পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফলই হলো পরিবেশ। এই উপাদানগুলোর মধ্যে প্রাণী, উদ্ভিদ, আলো, বাতাস, মাটি, উত্তাপ প্রভৃতি অন্যতম। 

পরিবেশ হলো পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ হতে ওজন স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত পরিমণ্ডলে বিদ্যমান আলো, বাতাস, পানি, মাটি, বন-পাহাড়, নদী, সাগরসহ গোটা উদ্ভিদ ও জীবজগত সমন্বয়ে যা সৃষ্ট তা-ই পরিবেশ। পরিবেশ দু ধরনের। একটি প্রাকৃতিক পরিবেশ। অন্যটি সামাজিক পরিবেশ। এখানে আলোচ্য বিষয় কেবল প্রাকৃতিক পরিবেশ যা কোনো স্থবির প্রক্রিয়া নয়; বরং একটি অনবদ্য প্রক্রিয়া।

পরিবেশ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দান বা অনুগ্রহ নয়; বরং তা হচ্ছে আল্লাহর কুদরত ও হেকমতের বিস্ময়কর অনন্য নিদর্শন। যা নিয়ে মানুষ যুগ যুগ ধরে চিন্তা করছে, গবেষণা করছে। যা মানুষের শিক্ষা ও গবেষণার পৃথক এক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক যুগে যাকে পরিবেশ বিজ্ঞান বলে।

পরিবেশ আল্লাহর অস্তিত্ব বহন করে। সত্যান্বেষী ও অনুসন্ধানকারীদের জন্য হেদায়াতের দিক-নির্দেশনা দেয়। যেমন, আল্লাহ যদি সূর্যের আলো কমিয়ে দিতেন, তাহলে পৃথিবী হয়ে উঠত বরফে আচ্ছাদিত। আর যদি সূর্যের আলো তীব্র করে দিতেন, তাহলে পৃথিবী হয়ে উঠত উত্তপ্তময় ও অগ্নিকুণ্ডের ন্যায়, যা কোনো ক্রমেই জীবজগতের অস্তিত্বের উপযোগী নয়। কিন্তু আল্লাহ পাক পরিবেশকে উপযোগী করে সুষম ভারসাম্যে সৃষ্টি করেছেন।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে—আমি প্রত্যেক বস্তুকে সুষমভাবে ও পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি। (সূরা আল কামার: আয়াত-৪৯) পরিবেশ দূষণ প্রক্রিয়া দুটি। একটি প্রাকৃতিক। যার পরিশোধনের ব্যবস্থাও রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে। যেমন, মানুষ নিঃশ্বাসের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড ছেড়ে পরিবেশকে দূষিত করছে। অন্যদিকে প্রকৃতি নিজেই বৃক্ষরাজির মাধ্যমে এই কার্বনকে গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে।

দ্বিতীয়টি মানবসৃষ্ট দূষণ প্রক্রিয়া। যেমন—

পারমাণবিক বর্জ্য।

রাসায়নিক বর্জ্য।

কল-কারখানার বর্জ্য।

গাড়ির কালো ধোঁয়া।

গাছ কাটা ও বন উজাড় করা।

যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা, মলমূত্র ত্যাগ করা।

নদী-নালার স্বাভাবিক গতিতে বাধা সৃষ্টি ও ভরাট করা।

পলিথিন ব্যবহার।

নির্বিচারে পশু, পাখি শিকার ও নিধন।

এই দূষণ ক্রিয়ার অনিবার্য প্রতিক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে ‘গ্রিন হাউস এফেক্ট’। একে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ও বলা হয়ে থাকে। দূষণের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়ে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। ফলে মিথেন ফ্লোরা ও কার্বন জাতীয় ‘গ্রিন হাউস’ প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী বিষাক্ত গ্যাসসমূহ জমা হয়ে বায়ুমণ্ডলের ওজন স্তরের ক্ষয় হবে। যার দরুন পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। ফলে বরফ গলে এবং সমুদ্র এলাকার বায়ুর চাপ কমে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে।

 এই কারণে গবেষকরা বলেছেন আগামী এক শতক নাগাদ সমুদ্রের পানির উচ্চতা আনুমানিক ১৩ সে. মি. বৃদ্ধি পাবে। ফলে ভূ-ভাগের কিছু অংশ অর্থাৎ, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও নেদারল্যান্ডসের মতো উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে আরো আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেছেন যে, এভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ ও আবহাওয়া দূষিত হতে থাকলে সমগ্র পৃথিবী তলিয়ে যাবে এবং পৃথিবী তার ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলবে। ফলে পৃথিবী তার আপন কক্ষ থেকে লাইনচ্যুত হয়ে অন্য গ্রহের সাথে সংঘর্ষ ঘটিয়ে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি করবে। 

ইসলামী পরিভাষায় যাকে কেয়ামত বা মহাপ্রলয় বলে। যা এতদিন বস্তুবাদী বিজ্ঞানীরা অবিশ্বাস ও অস্বীকার করে আসছিল। কিন্তু এখন তারা নিজেরাই সেই কেয়ামত বা মহাবিপর্যয় সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করছে। 

মহানবী (সা.) যা বিজ্ঞানের উন্নতির অনেক আগেই করে গিয়েছিলেন। যেমন পবিত্র কুরআনের সূরা তাকভীরের প্রথম ৫ আয়াত।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

১) সূর্য যখন আলোহীন হয়ে পড়বে।

২) এবং তারকারা যখন খসে পড়বে।

৩) আর পাহাড়সমূহ যখন চলতে শুরু করবে।

৪) আর যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনী গুরুত্বহীন হয়ে যাবে।

৫) আর বন্য পশুগুলো যখন একত্রিত করা হবে।

৬) আর সাগর যখন উত্তাল হয়ে পড়বে।

সূরা ইনফিতারের প্রথম ৩ আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

১) আকাশ যখন বিদীর্ণ হবে।

২) আর তারকারা যখন বিক্ষিপ্তভাবে ঝরে পড়বে।

৩) আর সাগরসমূহ যখন বিস্ফোরিত হবে।

অর্থাৎ, আকাশ টুকরো টুকরো হয়ে, তারকারা খসে পড়ে পাহাড় ধসে এবং সাগর-মহাসাগর উত্তাল হয়ে উপচে পড়ে পৃথিবীতে কিয়ামত বা মহাপ্রলয় সংঘটিত হবে।

এতদিন বস্তুবাদী বিজ্ঞানীরা এই ধ্বংসযজ্ঞ বা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে, আজ তারাই সেটাকে অত্যাধুনিক বস্তুগত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে প্রচার করছেন। 

শুধু তাই নয়; বরং এই মহাবিপর্যয় বা মহাপ্রলয় থেকে পরিত্রাণের জন্য বিভিন্ন উপায়ও প্রচার করছে। কিন্তু তাদের এসব হুঁশিয়ারি উচ্চারণ ও উপদেশবাণীর মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট অসঙ্গতি। 

কারণ, আজকের বিশ্ব পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তো ওরাই পুরোপুরি দায়ী। ওরাই তো পরিবেশটাকে এই দুরবস্থায় উপনীত করিয়েছে, যে অবস্থায় পরিশুদ্ধির কোনো ফুরসতই নেই। আবার ওরাই প্রতিষেধক ব্যবস্থা দিতে চায়। যার দরুন তাদের ব্যবস্থাপত্র কোনো কাজে আসছে না। 

যেমন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মূল উপাদান হলো পারমাণবিক বর্জ্য, রাসায়নিক বর্জ্য এবং শিল্প কারখানার বর্জ্য। আর এসবই সৃষ্টি হচ্ছে গুটি কয়েক উন্নত পশ্চিমা দেশ থেকে। যার পরিণাম ভোগ করতে হচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীকে। 

অন্যদিকে ওইসব দেশের জ্ঞানী বিজ্ঞানীরাই পরিচিত হয়ে উঠছেন পরিবেশবাদী হিসেবে। যারা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে পরিবেশ সংরক্ষণের এবং জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য বিভিন্ন সতর্কবাণী ও উপদেশবাণীর ব্যবস্থাপত্র সরবরাহ করছেন। বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন গড়ে তুলছেন। 

সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে পরিবেশবাদী হিসেবে বক্তৃতা করছেন। অথচ তাদের দেশের পারমাণবিক ও রাসায়নিক কার্যক্রম একটুও কমিয়ে আনছেন না। ফলে তারা জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা সমাধানে এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সঙ্গতিপূর্ণ সার্বজনীন ও আদর্শ কোনো নীতি বা ব্যবস্থা বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। আর তাই এসব স্বার্থপর বস্তুবাদী ব্যবস্থাপত্র যথার্থ কার্যকারিতা বয়ে আনতে পারছে না।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম বিকাশের অনেক অনেক আগেই আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবেশ দূষণ অনুভব করেছিলেন। বিপর্যয় সৃষ্টির অনেক পূর্বেই তিনি এ ব্যাপারে সম্যক জ্ঞাত ছিলেন। 

তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণমুক্ত রাখতে তিনি এক যুগান্তকারী ঘোষণায় বলেন, ‘কোন মুসলমান যদি বৃক্ষ রোপণ করে অথবা কোনো ফসল আবাদ করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি বা অথবা চতুষ্পদ জন্তু ভক্ষণ করে, তবে তা কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর জন্য সদকারূপে পরিগণিত হবে।’ (বুখারী, মুসলিম)

এতো হচ্ছে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। অন্যদিকে পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক কালজয়ী নীতি ও আদর্শ উপস্থাপন করেছেন। 

সেটা হলো, যেসব বস্তু পরিবেশ দূষণ করে যেমন—মলমূত্র, পচা-গন্ধা, নোংরা ও ময়লা আবর্জনা ইত্যাদিকে অপবিত্র বা অপরিচ্ছন্ন আখ্যায়িত করে ঘোষণা করেছেন, ‘পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।’ (আল হাদিস)

এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন মাজীদে ইরশাদ হচ্ছে, ‘যারা পবিত্র আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আত-তাওবাহ: আয়াত-১০৮) মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের অন্যস্থানে আরো ইরশাদ হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি পবিত্রতা অর্জন করলো। (ভেতর ও বাহিরে) সে অবশ্যই সফলকাম।’ (সূরা আল-আ’লা : আয়াত-১৪)

পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখার লক্ষ্যে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসও বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। যাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তুমি যদি নিশ্চিতভাবে জান যে, কেয়ামত এসে গেছে এবং তুমি দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছো না, তথাপি তোমার হাতে যদি রোপণ করার মতো একটি গাছের চারা থাকে, তবে সেই চারাটি রোপণ করে দেবে।’ (আল হাদিস)

পারমাণবিক, রাসায়নিক ও শিল্প বর্জ্য সম্পর্কে ইসলামের নীতি হলো যেসব বস্তু মানবজাতির জন্য দীর্ঘ মেয়াদী ও স্থায়ী ক্ষতিকারক এবং উপকারের চেয়ে অপকারেরই সম্ভাবনা বেশি, ওইসব বস্তু উদ্ভাবন, তৈরি ও ব্যবহার নিষেধ। 

তাই পারমাণবিক ও রাসায়নিক কর্মসূচী পরিহার করাই হলো মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ইসলামের প্রদর্শিত পরিবেশ সংরক্ষণ পদ্ধতি। আর তা এককভাবে কোনো দেশ, জাতি ও গোষ্ঠীর পক্ষে সম্ভব নয়। প্রয়োজন বিশ্বব্যাপী একই সাথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নীতি ও আদর্শ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। 

তাহলেই সম্ভব হবে মানবজাতিকে অকাল ধ্বংসের কবল থেকে কিছু সময়ের জন্য রক্ষা করা এবং কিছুক্ষণের জন্যে হলেও স্বস্তির সাথে বসবাসের সুযোগ করে দেয়া। তারপরও বিশ্বাস করতে হবে যে, কেয়ামত হবেই হবে। 

যে কোনোভাবেই হোক স্বীকার করতে হবে কেয়ামত বা মহাবিপর্যয় রোধে কোনো সামর্থ্য নেই মানুষের সীমিত শক্তির।

লেখক: গবেষক, মুহাদ্দিস ও রাজনীতিবিদ

 

 

কিউএনবি/আয়শা/৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:২৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit