বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন

হরমুজ দিয়ে এখনও দিনে পার হচ্ছে ১ কোটি ৩১ লাখ ব্যারেল তেল?

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২১ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :  যুদ্ধভীতি উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে খনিজ তেলের বিশাল প্রবাহ অব্যাহত রেখেছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। ইরানি হুমকি ও ভূরাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে তেল সরবরাহ সচল রাখতে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় ট্যাঙ্কার চলাচল, ট্র্যাকিং সংকেত বন্ধ রেখে চলা এবং বিকল্প রুটে তেল ঘুরিয়ে নেওয়ার মতো বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত দিন দিন হ্রাস পাওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য বজায় থাকায় বর্তমান ব্যবস্থাটিকে এখনো ঝুঁকিমুক্ত বলা যাচ্ছে না।

সামুদ্রিক তথ্য ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক ১৩.১ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৩১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১.৭১ কোটি ব্যারেল তেল অতিক্রম করত। বর্তমানের এই প্রবাহ পূর্বের সেই স্বাভাবিক ঘনত্বের প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। কেপলারের কমোডিটি রিসার্চ ডিরেক্টর ম্যাট স্মিথ বিশ্লেষণ করে জানান যে, কৌশলগত জলপথ দিয়ে এখনো এত বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের ভূরাজনৈতিক প্রভাব হারাচ্ছে ইরান।

গালফ নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই জটিল সামরিক ও লজিস্টিক কার্যক্রমে উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তারা তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ দিয়ে পাহারামূলক ব্যবস্থা চালু করেছে। পাশাপাশি অনেক জাহাজ অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) বা ট্র্যাকিং সংকেত বন্ধ করে তথাকথিত ‘ডার্ক ট্রানজিট’ প্রক্রিয়ায় হরমুজ অতিক্রম করছে। সরাসরি চলাচল কিছুটা কমায় প্রণালির বাইরে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের (শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার) প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, লোহিত সাগরের প্রধান বিকল্প রুট ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’-এ বিঘ্ন ঘটার পর সৌদি আরব আবারও তাদের বড় একটি চালানের প্রবাহ হরমুজ প্রণালির দিকে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে।

তবে সাময়িকভাবে তেল প্রবাহ ধরে রাখা সম্ভব হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এটি একটি সুসংগঠিত সমাধান মাত্র, কোনো স্থায়ী নিরাপদ ব্যবস্থা নয়। যুক্তরাষ্ট্র জাহাজ চলাচল রক্ষায় প্রচুর সামরিক সম্পদ মোতায়েন করে বাজারকে কিছুটা সময় গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল ঝুঁকি এখনো নিরসন হয়নি। নতুন কোনো সামরিক সংঘাতের বিস্তার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা কিংবা ইরানের পক্ষ থেকে আক্রমণ জোরদার করা হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা নিমেষেই অচল হয়ে পড়তে পারে। বাজার এ পর্যন্ত জরুরি লজিস্টিক ও মজুত তেলের ওপর নির্ভর করে তীব্র সংকট এড়িয়েছে, তবে তেল একটি ভৌত পণ্য হওয়ায় একসময় সংরক্ষিত মজুত শেষ হয়ে যাবে এবং পরিবহন ব্যবস্থার চাপ শেষ পর্যন্ত পণ্যের চড়া মূল্যের মাধ্যমেই সামাল দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের গত ১৭ সেপ্টেম্বরের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্যের মজুত প্রায় ৫৫ কোটি ৫০ লাখ (৫৫৫ মিলিয়ন) ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে। যদিও ব্যাংকটি আগে প্রায় ১৬০ কোটি ব্যারেল ক্ষয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল, বাস্তবে তা কমেছে ধারণার প্রায় এক-তৃতীয়ংশ। চীনে বড় ধরনের সঞ্চয় এবং ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় পর্যাপ্ত মজুত থাকায় বাজারের সামনে একটি সুরক্ষা দেয়াল রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এসব অঞ্চলকেও তেলের ঘাটতির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দিতে পারে। জেপি মরগানের গ্লোবাল কমোডিটি স্ট্র্যাটেজির প্রধান নাতাশা কানেভা জানান, অনিশ্চয়তা এতই প্রবল যে তারা ঐতিহ্যগত কোনো ভিত্তিমূলক পূর্বাভাস দিতে পারছেন না। এখন মূল বিষয় লড়াই কতদিন চলবে তা নয় বরং সংঘাতের মাঝে আন্তর্জাতিক বাজার কতটা সফলভাবে বস্তুগতভাবে পণ্য সরবরাহ ধরে রাখতে পারবে সেটাই আসল বিবেচ্য বিষয়।

এই সংকটের মধ্যে সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ (পেট্রোলাইন) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এই পাইপলাইনটির মাধ্যমে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্রগুলো থেকে লোহিত সাগরের প্রধান বন্দরগুলোতে অপরিশোধিত তেল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়, যা সরাসরি হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে যায়। দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতার এই লাইনে সংঘাত চলাকালে প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেল প্রবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু গত ১১ সেপ্টেম্বর একটি ড্রোন হামলায় পাইপলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বড় ধরনের আশঙ্কার সৃষ্টি হয়। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের হিসাবে, পেট্রোলাইনের এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের মোট সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ সাময়িকভাবে থমকে গিয়েছিল। তবে কয়েক দিনের দ্রুত মেরামতের পর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ নাগাদ ইয়ানবু বন্দরে আবার তেল খালাস শুরু হয়। বর্তমানে এই পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক ২০ থেকে ২৬.৫ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হচ্ছে, যা খুব শীঘ্রই ৩০ থেকে ৪০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হবে বলে কিপলার আশা করছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে যে কোনো অস্থিরতার সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ বিশ্ববাসীকে। প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম এখনো ১৫০ ডলারে না পৌঁছালেও সাধারণ ভোক্তা এবং পরিবহন খাত জ্বালানির আকাশচুম্বী দামের চাপে জর্জরিত। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন খুচরা ডিজেলের দাম সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি ৬.০৫ ডলারে ওঠার পর মাসের শেষে ৬.৫৩ ডলার স্পর্শ করেছে। ইউরোপেও ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ২.২৩ ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। পণ্য পরিবহন, কৃষিকাজ, নির্মাণযন্ত্র ও কারখানার জেনারেটরে ডিজেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই বর্ধিত খরচ খাদ্যসামগ্রীসহ সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর গিয়ে পড়ছে। একই সাথে এশীয় বাজারের চাহিদা মেটাতে কানাডার মতো নতুন সরবরাহকারী এবং রাশিয়ার মতো ছাড় দেওয়া জ্বালানি বিক্রেতা উঠে আসলেও বিশ্ব অর্থনীতি এখনো ভৌগোলিক সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।

সূত্র: গালফ নিউজ

কিউএনবি/অনিমা/৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সকাল ১১:০৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit