আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে আকর্ষণীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করা হয়। চাকরিতে যোগদানের সময় কর্মীদের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হয়।
এভাবে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ফাইভারে প্রতারণার জাল ছড়িয়ে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে একটি চিহ্নিত চক্র। নিজে কাজ না পেলে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের র্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত করার মিশনও চালায় চক্রটি। নামে-বেনামে শত শত ফেক ও ডামি অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। তথ্যানুসন্ধানে বেটোপিয়া গ্রুপ ঘিরে স্ক্যাম নেটওয়ার্কের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
চাকরি দেওয়ার নামে পাসপোর্ট-এনআইডি জব্দ করে অ্যাকাউন্ট খুলে রমরমা ব্যবসা চালানো হচ্ছে। আবার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েলে করতে সেসব অ্যাকাউন্ট থেকে ভুয়া কাজের অর্ডার দেওয়া হয়। পরে ইচ্ছাকৃত রিফান্ড করা হয়। দেওয়া হয় নেতিবাচক রিভিউ। এভাবে ফ্রিল্যান্সিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নকে পুঁজি করে ‘স্ক্যামিং’ নেটওয়ার্ক চালানো হচ্ছে।
ডিজিটাল দুনিয়ায় এমন ভয়াবহ অনিয়ম ও স্ক্যামের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে। এ চক্রের অন্যতম হোতা বেটোপিয়া গ্রুপের সিইও মনির হোসেন। গত জুলাইয়ের শেষের দিকে বেটোপিয়া সংশ্লিষ্ট তিন শতাধিক অ্যাকাউন্ট একযোগে বাতিল (সাসপেন্ড) করে ফাইভার কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে। একইসঙ্গে ফ্রিল্যান্সিংয়ে তরুণদের আগ্রহ ও আস্থায় ভাটা পড়বে। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানেও।
প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের টার্গেট করে কার্যক্রম চালায় বেটোপিয়া। একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের ফাইভারে কাজের অভিজ্ঞতায় (গিগ) পরিকল্পিতভাবে ভুয়া অর্ডার দেয়। পরে সেসব অর্ডার বাতিল বা রিফান্ড করে নেওয়া হয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ফ্রিলান্সারের পারফরম্যান্স ও র্যাংকিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
বেটোপিয়ার আক্রোশের শিকার ভুক্তভোগী ফ্রিল্যান্সার নাহিদ ইসলাম যুগান্তরকে জানান, একদিন হঠাৎ দেখি, আমার অ্যাকাউন্টে দুটি ডিজাইনের অর্ডার এসেছে। আবার কিছুক্ষণ পরই দুটিই বাতিল হয়ে যায়। আমি টপ সেলার হওয়ায় বিষয়টি আমার খটকা লাগে। এরপর অর্ডার দুটির তথ্য অনুসন্ধান শুরু করি।
জানতে পারি-বেটোপিয়া গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সফটভেন্সের কর্মীদের অ্যাকাউন্ট থেকে দুটি অর্ডার করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেই। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে পুলিশ দিয়ে হেনস্তা করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মী যুগান্তরকে জানান, অনিয়ম নিয়ে অফিসে একাধিকবার বিরোধিতার ঘটনা ঘটেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে এক কর্মী প্রশ্ন তোলায় তাকে কক্ষে আটকে রেখে মারধর করেন গ্রুপের লোকজন। সাবেক কর্মীরা জানান, বেটোপিয়া প্রতিষ্ঠার আগে একই ব্যবসা ‘বিডি কলিং আইটি’ নামে পরিচালিত হতো।
মার্কেটপ্লেসের নীতিমালা লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ওই নামের নেতিবাচক পরিচিতি তৈরি হলে পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে নতুন পরিচয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। নেতিবাচক ভাবমূর্তি আড়াল করে নতুন কর্মী আকর্ষণে বিভিন্ন সময়ে ফায়ার এআই, জেভি এআই, স্পার্কটেক, সফটভেন্স ও এসএম টেকসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
আকর্ষণীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফ্রেশারদের ‘ট্রেইনি’ বা ‘ইন্টার্ন’ হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আলীম যুগান্তরকে বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে ফেক অ্যাকাউন্ট, ভুয়া অর্ডার বা প্রতিদ্বন্দ্বীর গিগ ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চাকরি দেওয়ার নামে ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খুলে তা অনৈতিক কাজে ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুতর।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের পুরো ফ্রিল্যান্সিং খাতের ওপর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এসব স্ক্যামারের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনগুলোরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কারো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় যেন দেশের লাখো সৎ ফ্রিল্যান্সারের ওপর না পড়ে এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বেটোপিয়া গ্রুপের সিইও মনির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠানোর চার দিন পরও কোনো জবাব না আসায় তার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করা হয়। এরপর বেটোপিয়ার পিআর ও মিডিয়া মুখপাত্র তানুভীরুল ইসলাম জানান, প্রশ্নগুলো তারা পেয়েছেন। প্রশ্নগুলোর উত্তর সাত কর্মদিবসের মধ্যে দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময় পার হলেও বেটোপিয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য বা জবাব পাওয়া যায়নি।
কিউএনবি/আয়শা/২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:৩০