আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পরাশক্তিগুলোর রাজনীতি থেকে দূরে থেকে জাতিসংঘকেন্দ্রিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে জোরদার করার লক্ষ্যে গঠিত নতুন বৈশ্বিক জোট ‘পার্টনার্স ফর মাল্টিল্যাটারালিজম’ (পিফোরএম)-এর প্রথম অধিবেশনে যোগ দিচ্ছে ভারত। এ উদ্দেশ্যে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নিউ ইয়র্কে অবস্থান করছেন। গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ‘উচ্চপর্যায়ের বিতর্ক’ অধিবেশন শুরুর সময় তিনি নিউইয়র্কে পৌঁছান। সেখানে একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখবেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রাজিল, কেনিয়া এবং কানাডার নেতাদের উদ্যোগে গঠিত এই পিফোরএম জোট চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে নিজেদের অবস্থান ও লক্ষ্য তুলে ধরবে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এ প্রকাশিত একটি যৌথ সম্পাদকীয় নিবন্ধে জোটের চার প্রতিষ্ঠাতা শীর্ষ নেতা পিফোরএম-এর মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার করেছেন। তারা লিখেছেন, এই জোট বিশ্বসংস্থাকে কেবল সমর্থনই করবে না বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মতো আধুনিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও প্রস্তুত করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রস্তাব দেবে। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, জাতিসংঘসহ অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, বৈধ, কার্যকর এবং বিশ্বস্ত করে তোলার লক্ষ্যে এই জোট কাজ করবে। সম্পাদকীয় নিবন্ধটি লিখেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুল্লা দা সিলভা, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া এক ভাষণে মিডল পাওয়ার বা মধ্যম শক্তির দেশগুলোর একতাবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে কথা বলেছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ওই বক্তব্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একমুখী পদক্ষেপ ও সংঘাতের কারণে রাশিয়া ও চীনের প্রতি এবং দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি, শুল্ক আরোপ, সম্প্রসারণবাদী সিদ্ধান্ত ও ইরানের সংঘাত ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল।
তবে জোট প্রতিষ্ঠাতা চার নেতার এই যৌথ বিবৃতিতে ভারতকে স্বাক্ষরকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। কারণ ভারত ইতোমধ্যে নন-অ্যালাইনড মুভমেন্ট (ন্যাম), ব্রিকস, জি-২০ এবং জি-৪-এর মতো বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় জোটের সদস্য, যাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনেকটাই একই রকম।
সোমবারে প্রকাশিত যৌথ সম্পাদকীয়টিতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের উল্লেখ করা হয়। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছিলেন, বিশ্বমঞ্চে পরাশক্তিগুলো এখন তাদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা টের পাচ্ছে। সেই বক্তব্যের সূত্র ধরে পিফোরএম নেতারা উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন সম্মিলিত প্রচেষ্টার অসাধারণ শক্তিকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। চলতি বছরেই মেয়াদ শেষ হতে চলা আন্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি দ্য হিন্দুসহ বিশ্বের প্রধান পাঁচটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশ্বরাজনীতির বর্তমান স্থবিরতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সময় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, কিছু পরাশক্তি এখনও নিজেদের ক্ষমতার সীমা যে নির্দিষ্ট, তা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়। এর ফলে তারা এমন কিছু অভিযানে জড়িয়ে পড়ছে যার ফল অত্যন্ত মারাত্মক হচ্ছে। গুতেরেস বিশেষভাবে রাশিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, চার বছর পার হয়ে গেলেও দেশটি এখনও ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের যুদ্ধ নিয়ে নানাবিধ প্রতিকূলতার মুখে পড়ছে। মহাসচিব মন্তব্য করেন যে, পরাশক্তিগুলোর উচিত তাদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বোঝা, যা বিশ্বকে আরও শান্তিপূর্ণ করে তুলতে সহায়ক হবে।
পিফোরএম-এর প্রতিষ্ঠাতা নেতারা অবশ্য এটি স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের এই জোট কোনো নতুন এক্সক্লুসিভ ব্লক বা আন্তর্জাতিক আমলাতন্ত্র তৈরি করবে না। বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন অঞ্চল ও রাজনৈতিক পটভূমির দেশগুলোর জন্য একটি নমনীয় ও উন্মুক্ত কাঠামো তৈরি করা, যারা পারস্পরিক বিভেদ ভুলে সংস্কারের স্বার্থে জোট বাঁধতে এবং অভিন্ন নীতিগুলোকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপে রূপান্তর করতে ইচ্ছুক। যৌথ সম্পাদকীয়তে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৩৫টি দেশে সর্বোচ্চসংখ্যক রাষ্ট্রভিত্তিক সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ১৯৪৬ সালের পর থেকে সর্বাধিক। একই সময়ে বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় রেকর্ড তিন ট্রিলিয়ন ডলারে, যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
সূত্র: দ্য হিন্দু
কিউএনবি/অনিমা/২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ৮:২৬