বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম
ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখে বাংলাদেশ, বাড়ছে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি: রয়টার্সের প্রতিবেদন কক্সবাজারে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএন সদস্য গ্রেপ্তার পাট রফতানি করে ১০ বছরে বাংলাদেশের আয় ৮৪ হাজার কোটি টাকা ডিজিটাল ফিতনার বিস্তার ও ইসলামের প্রতিকার আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা ঈমানের দাবি কেরানীগঞ্জে কারখানা সিলগালা, লাখ টাকা জরিমানা স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব কিনছেন মেসি ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ, এনসিপি নেত্রী কারাগারে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কংগ্রেসের আপত্তি, নীরব সম্মানে বিশেষ বার্তা ফারুক ও ওমরের স্ত্রীকে ডিভোর্সে গুণতে হবে ২২ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা!

ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখে বাংলাদেশ, বাড়ছে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি: রয়টার্সের প্রতিবেদন

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ Time View
আন্তর্জাতিক ডেস্ক  : বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সরবরাহ সংকট এবং নিয়মিত কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কারণে দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রামক এই রোগ। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট।মার্চে বর্তমান প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে হাম-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। একই সময়ে ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে নানা ধরনের বিঘ্ন ঘটায় বিপুলসংখ্যক শিশু হাম প্রতিরোধী সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় টিকাদান কার্যক্রম ও টিকা সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়। নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা এ ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় এ বয়সে হাম টিকা দেওয়া হয় না।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্য থাকলেও পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি টিকাদান কর্মসূচি দিয়ে বর্তমান সংকট পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তাদের জন্য বিশেষ ক্যাচ-আপ কর্মসূচি প্রয়োজন।

রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, গত দুই বছরে টিকাদানের ঘাটতি বাংলাদেশকে হাম নির্মূলের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে দিয়েছে। একই সময়ে এত বিপুলসংখ্যক হাম রোগী এবং মৃত্যুর ঘটনা দেশে আগে দেখা যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তার মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকার ঘাটতি পূরণ, টিকাদানের আওতা বাড়ানো এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

টিকা সংগ্রহের নীতিতেও পরিবর্তনকে বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সংসদে তিনি জানান, সংগ্রহ পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে একপর্যায়ে টিকা সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছিল। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাতের বিষয়টি তুলে ধরেছে। হাম প্রাদুর্ভাবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শিশুদের ওপর। প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে আক্রান্তদের বড় অংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যার ব্যবস্থা করা হলেও রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে অনেক শিশুকে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চিকিৎসক নন্দদুলাল সাহা জানান, হাসপাতালটির স্বাভাবিকভাবে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেখানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাম রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শিশুদের স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণের সংকটও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। হামের পাশাপাশি দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর দ্বৈত চাপ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৪৫ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

মঙ্গলবার একদিনেই ডেঙ্গুতে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন। চলতি বছরে এক দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা। হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেক পরিবারকে সন্তানদের চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।

১৩ মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগম। প্রায় দুই মাস আগে তার সন্তান হাম আক্রান্ত হওয়ার পর চারটি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার পরও শিশুটির জ্বর ফিরে আসছে এবং সে পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।

নাসিমার ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থ থাকার কারণে নির্ধারিত সময়ে ছেলেকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে টিকা না পাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। তার আগের চার সন্তান অবশ্য নিয়মিত টিকা পেয়েছিল।

অন্যদিকে কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপনের আট মাস বয়সী মেয়েও হামসদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কয়েক দিন পর শিশুটির শরীরে আবার ফুসকুড়ি দেখা দিলে পরিবারটি একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসার চেষ্টা করে। পরে বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।

রিপনের অভিযোগ, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরলেও তারা অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য ও সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। জ্বর ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি এর সাধারণ উপসর্গ হলেও টিকার মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সাধারণত দুই ডোজ টিকা হাম থেকে সুরক্ষা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং তাদের জন্য ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হলে ভবিষ্যতে এমন বড় প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

বর্তমান সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশুরাই। তাই হাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াকেই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র:রয়টার্স

কিউএনবি/অনিমা/০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ৯:৩৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit