শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম

জেন জেডের পথ ধরে শিক্ষার অধিকার চাইছে ভারতের জেন আলফা

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতের উত্তর প্রদেশের সামুহি ভাটপুরওয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেদিন ক্লাশ শুরুর সময় পেরিয়ে গেলেও ১২২ শিক্ষার্থীর কেউ শ্রেণিকক্ষে ঢুকছিল না। তবে এবার তারা ক্লাশ ফাঁকি দিতে নয়, বরং স্কুল কর্তৃপক্ষকে কিছু শেখাতেই দাঁড়িয়েছিল প্রতিবাদে।

পুরোনো ও জরাজীর্ণ ভবনটির একটি অংশ এখনো ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছে। ২০২৩ সালে একটি দেয়াল ধসে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার পরও ভবনটি সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। এরপর থেকেই নিরাপদ ভবনের দাবিতে শিশুরা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে আসছিল। কিন্তু তাতে সাড়া না পেয়ে গত ২২ আগস্ট তারা ব্যতিক্রমী প্রতিবাদে নামে।

শিশুদের এই আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিদ্যালয়ে যান। ব্লক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক আওয়াস্থি শিক্ষার্থীদের নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস দিলে তারা বাড়ি ফিরে যায়। প্রিয়া জানায়, স্কুল ভবনের দুরবস্থা তাদের সবসময় ভয়ের মধ্যে রাখে। ভবনটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে—এই আশঙ্কায় পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই সবাই মিলে প্রতিবাদে নামার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

শুধু উত্তর প্রদেশ নয়, ভারতের অন্তত ১০টি রাজ্যে একই ধরনের প্রতিবাদ হয়েছে। মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি স্কুলে জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে শিক্ষার্থীরা মৌলিক সুযোগ-সুবিধার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার জরাজীর্ণ সরকারি বিদ্যালয়গুলোতেই এসব প্রতিবাদ বেশি দেখা যাচ্ছে।

জেন জেড থেকে জেন আলফা

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে অনেকে জেন আলফার নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার সূচনা হিসেবে দেখছেন। এর আগে চলতি বছরের জুন থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির জন্তর মন্তরে হাজারো জেন জেড তরুণ বিক্ষোভ করেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে তারা জবাবদিহি দাবি করেন।

আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি), যা বড় আকারের বেকারত্ব ও শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার প্রতিবাদে মে মাসে গঠিত হয়। বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের পর আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।

এরপর সিজেপি স্কুলগুলোর অবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে সংগঠনটি ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মসূচি শুরু করে।

সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং বলেন, দিল্লির আন্দোলনের সময় গ্রামাঞ্চল থেকে আসা অনেক শিশু ও তাদের অভিভাবকের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং স্কুলে যাওয়ার অনুপযোগী রাস্তার সমস্যার কথা তারা তুলে ধরেন। এসব সমস্যার সমাধানে স্কুলকেন্দ্রিক আন্দোলন তাদের বৃহত্তর কর্মসূচির স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা।

মৌলিক সুবিধার সংকটে বহু স্কুল

ভারতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। প্রায় ২৪ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী ১৫ লাখ স্কুলে পড়াশোনা করে। এর প্রায় ৭০ শতাংশ স্কুল কেন্দ্র, রাজ্য বা স্থানীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত।

সরকারি হিসাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ও স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। কোথাও স্কুল ভবন এতটাই জরাজীর্ণ যে সেখানে গবাদিপশুও রাখা হয়।

শিক্ষা অধিকারকর্মী নাগাসিমহা রাও বলেন, শিশুরা তাদের মৌলিক অধিকার চাইছে—শিক্ষক, বেঞ্চ, নিরাপদ ভবন, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচাগার। দীর্ঘদিন ধরে এসব মৌলিক অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি রয়েছে সরকারি স্কুলগুলোতে।

উত্তর প্রদেশের সর্বোদয়া ইন্টার কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনোজ জানায়, তাদের স্কুলে বিদ্যুৎ নেই, গরমে পাখা চলে না, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই এবং পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে মেঝেতে বসে ক্লাস করতে হয়। তাই তারা প্ল্যাকার্ড নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদে নামে।

শুধু অবকাঠামো নয়, শিক্ষক সংকটও বড় সমস্যা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এক লাখের বেশি স্কুলে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন। এসব স্কুলে প্রায় ২৯ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। আবার শিক্ষার্থী নেই এমন ‘ভূতুড়ে স্কুল’-এর সংখ্যাও পাঁচ হাজারের বেশি।

মিড-ডে মিলের খাবারের মান নিয়েও বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ হয়েছে। বিহারের সিমুয়ারা গ্রামের প্রায় ৫০ শিক্ষার্থী চার কিলোমিটার হেঁটে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে গিয়ে নিম্নমানের খাবারের অভিযোগ জানায়।

ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

শিক্ষাবিদ স্বর্ণা রাজাগোপালনের মতে, ভারতের স্কুলব্যবস্থায় প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। সর্বত্র সমমানের অবকাঠামো, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, পরিবারগুলোকে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত করা এবং নিয়ম না মানলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

ভারতের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আজ যারা স্কুলের শিক্ষার্থী, তাদের অনেকেই ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ভোট দেওয়ার বয়সে পৌঁছে যাবে।

শিক্ষা অধিকারকর্মী আকাশ সরকার বলেন, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। উপযুক্ত পরিবেশে শিক্ষা না পেলে ভারতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আগামী দিনের ভোটাররা শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থ বিবেচনা করেই ভোট দিতে পারে।ব্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুজাতা গৌড়ার মতে, জেন জেডের পর জেন আলফার প্রতিবাদও আকস্মিক নয়। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামছে।

তার ভাষায়, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে সাজানো প্রয়োজন। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, সুষ্ঠু পরীক্ষা এবং উন্নত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। আর এসবের জন্য কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে হবে; তা না হলে দেশজুড়ে আরও বড় আন্দোলন দেখা দিতে পারে।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/দুপুর ১:৪৪

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit