আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পাঁচ দিন পরও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ৪ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া লাশের বিপুল সংখ্যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, উচ্চ হিমালয়ে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস থেকেই এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত। এর ফলে লেন্দে খোলায় আকস্মিক পানির ঢল নামে এবং পানি, পাথর ও পলির স্রোত ভুটে কোশি-ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে এই প্রক্রিয়ায় একটি নতুন হ্রদও তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও একটি আকস্মিক বন্যার কারণ হতে পারে।
প্রাথমিক ধস ঠেকানো নেপালের পক্ষে বাস্তবসম্মতভাবে সম্ভব ছিল না। তবে এই বিপর্যয় জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতায় দেশটির দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বড় ঘাটতিগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে।
দ্রুত কার্যকর সতর্কতা ব্যবস্থা প্রয়োজন
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহ ও বন্যার ঝুঁকি শনাক্তে নেপালের জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ও অর্থায়নকৃত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা প্রয়োজন। অস্থিতিশীল হিমবাহ, ভূমিধসের কারণে আটকে থাকা হ্রদ এবং নদীপথগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মানচিত্রায়ন করতে হবে।
একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সেন্সরগুলো পুনরুদ্ধার করে পাহাড়ি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ও নদীর নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ২৪ ঘণ্টা তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চীনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত তথ্য আদান-প্রদানও জোরদার করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের আগে পাহাড়, নদী ও হিমবাহের পরিস্থিতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা থাকায় কখন মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে, তার স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। পাশাপাশি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র, মোবাইল ফোনে এসএমএস সতর্কতা, সাইরেন এবং স্থানীয় রেডিওর মতো একাধিক যোগাযোগব্যবস্থা চালু রাখতে হবে।
জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো
হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ, হিমবাহ-হ্রদ এবং পাহাড়ের ঢাল ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ফলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
শুধু আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বন্যা, ভূমিধস ও পাহাড়ি অঞ্চলের অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম সেতু, সড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও সরকারি স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে। স্থানীয় মানুষের নেতৃত্বে অভিযোজন কর্মসূচির মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা, জনসেবা, জীবিকা সুরক্ষা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে নদীর নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য দুর্যোগের আগেই প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
নেপালের পাশে দাঁড়াতে হবে ধনী দেশগুলোকে
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বিশ্বের ধনী ও উচ্চ নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছ থেকেও নেপাল কার্যকর সহায়তা প্রত্যাশা করছে। শুধু নিহত নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা প্রতীকী সমবেদনা জানানো যথেষ্ট নয়।
নেপালের পুনর্গঠন ও ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থ এখনই দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতির জন্য গঠিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ থেকে নেপালকে সরাসরি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এই অর্থ নতুন অনুদান হিসেবে আসা উচিত, পুরোনো সহায়তার নাম পরিবর্তন করে নয়; ঋণ হিসেবেও নয়।
কারণ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ধীরে ধীরে নয়, কখনো কয়েক মিনিটের মধ্যে উপত্যকা ভাসিয়ে দেওয়া পানি ও কাদার স্রোত হয়ে হাজির হয়।
তাই নেপালের দাবি দয়া বা দাতব্য সহায়তার নয়; এটি জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি।
দুর্যোগের পর নেপালের তরুণ সমাজ দ্রুত এগিয়ে এসেছে। দেশজুড়ে তরুণেরা ‘রাসুয়া রিলিফ গ্রুপ’ গঠন করে অর্থ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ, সহায়তার সমন্বয় এবং যাচাই করা তথ্য প্রচারের কাজ করছে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা
কিউএনবি/আয়শা/০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/বিকাল ৩:০৫