সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
আইটি, এআই, সার ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে মারুবেনি কর্পোরেশনকে আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর জার্মান পর্যটকের মালামাল চুরি করা যুবককে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা উচ্চ আয়ের পাশাপাশি যে ১০ পেশায় রয়েছে কাজের আনন্দ খাবারের আগে অলিভ অয়েল খেলে রক্তে শর্করা বাড়ে ধীরে, বলছে গবেষণা প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সরকারদলীয় এমপিদের বৈঠক ফ্যাটি লিভার থেকে লিভার ক্যানসার, যে ৭ লক্ষণে হবেন সতর্ক নিজের মত প্রকাশ করলে কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে ‘অলক্ষ্মী’: ইশা সাহা ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মিলল নানা পাটেকারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ দুর্গাপূজায় টানা তিন দিন বন্ধ থাকবে ব্যাংক জমাদিউল আউয়ালের চাঁদ দেখা যায়নি

সংকটের দশ বছর: রোহিঙ্গাদের ফেরার অপেক্ষা শেষ কোথায় ?

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪৯ Time View

ডেস্ক নিউজ : ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নিরাপত্তাহীনতা, নির্যাতন ও সহিংসতার মুখে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে শুরু করেন। দেখতে দেখতে সেই ঘটনার নয় বছর পেরিয়ে আজ দশম বছরে প্রবেশ করেছে রোহিঙ্গা সংকট। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়ে তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছে, এরপর এসেছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনা করছে। সরকার পরিবর্তন হলেও রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে একটি অবস্থান মোটামুটি অপরিবর্তিত থেকেছে—রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে রাখাইনে ফেরানোই স্থায়ী সমাধান।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত বছর পরও প্রত্যাবাসনের কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি। প্রতি বছর ২৫ আগস্ট এলেই একই প্রশ্ন সামনে আসে—কবে ফিরবেন রোহিঙ্গারা? আদৌ কি তারা নিরাপদে নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারবেন?

ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হিসেবে প্রত্যাবাসনকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সরকারের বক্তব্য, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিকল্প নেই।

বর্তমান সরকার একই সঙ্গে অভিযোগ করছে, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগে ঘাটতি থাকায় সংকটটি দীর্ঘায়িত হয়েছে। তবে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—আগের ব্যর্থতার জায়গা থেকে বেরিয়ে বাস্তবে প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ এমন একটি সংকটের ভার বহন করছে যার সৃষ্টি বাংলাদেশের কারণে নয়। ফলে এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা, রাজনৈতিক মনোযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতাকে আরও সমন্বিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ওপর যে ধরনের দায়িত্ব ও পরামর্শ চাপিয়ে দেওয়া হয়, একই মাত্রার চাপ মিয়ানমারের ওপরও তৈরি করতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি। গত এক দশকে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে তালিকা যাচাইকে কেন্দ্র করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পরও তালিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ায় প্রক্রিয়াটি আরও দীর্ঘ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

চলতি আগস্টে মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকার মধ্যে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। দেশটির দাবি অনুযায়ী, যাচাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে মিয়ানমার দাবি করেছে, ৪ হাজার ২৪১ জন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়েও আপত্তি জানিয়ে আসছে। দেশটির সরকারি অবস্থানে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।

ঢাকা অবশ্য এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াউ সোয়ে মোয়েকে ডেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের দেওয়া তথ্যের অনেকটাই সঠিক নয়। বাংলাদেশের বক্তব্য, জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে।

বাংলাদেশ দ্রুত যাচাই প্রক্রিয়া শেষ করার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের তথ্যও প্রক্রিয়ার আওতায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা।

রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তার আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ১০ বছরের এই সংকট আরও দীর্ঘ হয়ে ২০ বছরের সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়—দুই পর্যায়েই আলোচনা চালিয়ে যাবে। লক্ষ্য থাকবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, সম্মানজনক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে পারে এবং সহায়তা অব্যাহত রাখতে পারে। কিন্তু যে সংকট বাংলাদেশের তৈরি নয়, তার একক সমাধান বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়—এ কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি।

শামা ওবায়েদের মতে, মানবিক সহায়তা এখন অত্যন্ত জরুরি হলেও এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। সংকটের উৎপত্তি যেহেতু মিয়ানমারে, তাই এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারকেই নিতে হবে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের বক্তব্যেও একই বিষয় উঠে এসেছে। তার মতে, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির পেছনে রাজনৈতিক, আইনগত ও নিরাপত্তাজনিত কারণ রয়েছে। ফলে শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে সমস্যার মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুতির সময় যত বাড়বে, ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকবে। বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য তাই কেবল শরণার্থী শিবিরে মানবিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা।

প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় এই প্রক্রিয়া অনেক সময় বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আগে হওয়া চুক্তির ভিত্তিতে দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য যাচাই প্রক্রিয়া চালুর ওপর জোর দিচ্ছে ঢাকা।

রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়। এর প্রভাব বঙ্গোপসাগর, আসিয়ান অঞ্চল এবং বৃহত্তর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূরাজনীতিতেও পড়ছে।

এ কারণে সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন দেশের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত আন্তর্জাতিক কাঠামো প্রয়োজন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক স্থিতিশীলতার বিষয় হিসেবেও সংকটটিকে দেখতে হবে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান ও সহিংসতার মুখে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার ঢল নামে। কয়েক মাসের মধ্যেই প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেন। এর আগে থেকেই সেখানে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছিলেন।

বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, স্থানীয় জনজীবন এবং নিরাপত্তার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৭ সালের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সম্মতি দেয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও হয়।

২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মতো নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে না করায় তারা প্রত্যাবাসনে সম্মত হননি।

এরপর বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হলে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক আলোচনায় কিছুটা গুরুত্ব হারায়। এর মধ্যেই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। ক্ষমতা নেয় সেনাবাহিনী। ফলে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

পরবর্তী সময়ে চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হলেও সেগুলোও সফল হয়নি। এরই মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত তীব্র হওয়ায় রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ফলে এক দশক পরও রোহিঙ্গা সংকটের চিত্র অনেকটাই একই—বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, আর নিজ ভূমিতে ফেরার অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

দশ বছর পূর্ণ হওয়া তাই শুধু একটি সময়ের হিসাব নয়; এটি একটি অসমাপ্ত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া, দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্নেরও প্রতিচ্ছবি।

কিউএনবি/অনিমা/২৫ অগাস্ট ২০২৬,/দুপুর ১২:৩২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit