তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : চাঁদের দক্ষিণ মেরুর এমন কিছু গহ্বর রয়েছে, যেখানে কোটি কোটি বছর ধরে সূর্যের আলো পৌঁছায়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব চিরস্থায়ী অন্ধকারাচ্ছন্ন গহ্বরের ভেতরে জমে থাকতে পারে বরফ আকারে পানি। সেই পানির সন্ধান ও চাঁদের ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানের নতুন সম্ভাবনা খুঁজতেই এবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে চীন।
চীনের চ্যাং’ই-৭ নামের মনুষ্যবিহীন রোবোটিক মহাকাশযান মিশনটি ২৪ আগস্ট থেকে উৎক্ষেপণ করা হতে পারে। তবে উৎক্ষেপণের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ২৪ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। অর্থাৎ আবহাওয়া ও অন্যান্য প্রস্তুতি অনুকূলে থাকলে এই সময়ের যেকোনও দিন মিশনটি উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।
এটি হবে চীনের এখন পর্যন্ত সপ্তম এবং সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী চন্দ্র অভিযানগুলোর একটি। মিশনের মূল লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরুর স্থায়ীভাবে ছায়াচ্ছন্ন গহ্বরগুলোতে পানির বরফের সন্ধান করা এবং সেখানে থাকা সম্পদের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা।
চ্যাং’ই-৭ মিশনে থাকছে কী?
চ্যাং’ই-৭ মিশনে চারটি প্রধান অংশ থাকবে- একটি অরবিটার, একটি ল্যান্ডার, একটি রোভার এবং একটি হপার। প্রতিটির কাজ হবে আলাদা।
অরবিটার
অরবিটার হবে মিশনের মূল মহাকাশযান। এটি চাঁদের কক্ষপথে অবস্থান করে পুরো অভিযানজুড়ে চাঁদের পৃষ্ঠের মানচিত্র তৈরি ও ছবি তুলবে।
এছাড়া মিশনের অন্যান্য অংশ এবং পৃথিবীর মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এটি।
ল্যান্ডার
ল্যান্ডার চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করবে। এতে থাকবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, যার মাধ্যমে চাঁদের মাটি, শিলা ও পরিবেশ পরীক্ষা করা হবে।
ল্যান্ডারটি শ্যাকলটন ক্রেটারের কাছাকাছি এলাকায় অবতরণের লক্ষ্য নিয়ে এগোবে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে অবস্থিত এই বিশাল গহ্বরটির ব্যাস প্রায় ২১ কিলোমিটার।
এর আগে চাঁদে পাঠানো কোনও মিশনই এতটা কাছাকাছি দক্ষিণ মেরু এলাকায় পৌঁছাতে পারেনি।
রোভার
রোভার হবে ছোট আকারের একটি স্বয়ংক্রিয় যান। এটি ল্যান্ডারের আশপাশে চাঁদের পৃষ্ঠে চলাচল করবে এবং স্থানীয় পরিবেশ পরীক্ষা করবে।
রোভারটির সাহায্যে চাঁদের শিলা ও মাটির নমুনা এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
হপার
মিশনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর একটি হলো হপার। সৌরশক্তিচালিত এই ছোট রোবোটিক যানটি চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে অল্প দূরত্বে লাফ দিয়ে বা উড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে আবার অবতরণ করতে পারবে।
হপারটির মূল লক্ষ্য হবে শ্যাকলটন ক্রেটারের মতো গভীর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকায় প্রবেশ করে সেখানকার পরিবেশ ও সম্ভাব্য পানির বরফ অনুসন্ধান করা।
চাঁদে পানি আছে- বিজ্ঞানীরা কীভাবে নিশ্চিত হলেন?
চাঁদে পানি থাকার সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু দশক ধরে আলোচনা করছেন। এমনকি ১৯৬৯ সালে প্রথম অ্যাপোলো অভিযান চাঁদে মানুষ পাঠানোর আগেও বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ নিয়ে ধারণা ছিল।
তবে ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে অ্যাপোলো অভিযানের নভোচারীরা চাঁদ থেকে মাটির নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে আসার পর সেগুলোকে প্রথমে প্রায় শুষ্ক বলেই মনে হয়েছিল।
পরবর্তী কয়েক দশকে বিভিন্ন মহাকাশ অভিযান চাঁদে পানি ও হাইড্রোজেনের অস্তিত্বের প্রমাণ সংগ্রহ করে।
এরপর ২০০৯ সালে নাসা চাঁদের একটি ছায়াচ্ছন্ন গহ্বরে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি রকেটের অংশ ও একটি অনুসন্ধানী যান আছড়ে ফেলে। আঘাতে চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে যে ধূলিকণার মেঘ তৈরি হয়, সেটি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ আকারে পানির অস্তিত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রত্যক্ষ প্রমাণগুলোর একটি পান।
২০২০ সালের অক্টোবরে নাসার বিজ্ঞানীরা জানান, চাঁদে পানি থাকার বিস্তৃতি আগের ধারণার চেয়েও বেশি।
তারা চাঁদের পৃষ্ঠের খনিজ কণার ভেতরে পানির অণু আটকে থাকার প্রমাণ পান। একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, চাঁদের এমন কিছু অংশে আরও পানি বরফ হিসেবে জমে থাকতে পারে, যেখানে কখনও সূর্যের আলো পৌঁছায় না।
চাঁদের ‘চিরস্থায়ী অন্ধকার’ কী?
চাঁদের উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি গভীর গহ্বরের কিছু অংশে সূর্যের আলো কোটি কোটি বছর ধরেও পৌঁছায়নি। এসব এলাকাকে বলা হয় চিরস্থায়ী ছায়াচ্ছন্ন অঞ্চল।
গভীর গহ্বরের ভেতরে থাকা এসব এলাকায় তাপমাত্রা অত্যন্ত কম। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পানি বরফ আকারে টিকে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
২০১৮ সালেই নাসার পর্যবেক্ষণে চাঁদের ছায়াচ্ছন্ন এলাকায় পানির বরফের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে আরও গবেষণায় সেই ধারণা শক্তিশালী হয়েছে।
এবার চ্যাং’ই-৭ মিশনের অন্যতম লক্ষ্য হলো এই বরফের অবস্থান, গভীরতা ও প্রকৃতি সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা।
চাঁদের পানি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
চাঁদে পানির সন্ধান শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটানোর বিষয় নয়। ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান এবং মহাকাশ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এর বিশাল গুরুত্ব থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, চাঁদের মেরু অঞ্চলের প্রাচীন বরফের স্তর হয়তো চাঁদের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এবং ধূমকেতু ও গ্রহাণুর মাধ্যমে পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থায় পানি পৌঁছানোর ইতিহাস সংরক্ষণ করে রেখেছে।
অর্থাৎ, চাঁদের বরফ বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর মহাসাগরের উৎপত্তি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানে পানির ব্যবহার
যদি চাঁদে পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং সহজে আহরণযোগ্য পানি পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ মনুষ্যবাহী অভিযানে সেটি পানীয় জলের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
এমনকি চাঁদে থাকা যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখার কাজেও পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পানির অণু ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করা সম্ভব। হাইড্রোজেনকে রকেটের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, আর অক্সিজেন নভোচারীদের শ্বাস নেওয়ার কাজে লাগতে পারে।
এতে চাঁদ ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহসহ আরও দূরের মহাকাশ অভিযানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে।
চাঁদের পানি কি কেউ নিজের বলে দাবি করতে পারবে?
চাঁদে পানি পাওয়া গেলে তা নিয়ে ভবিষ্যতে মালিকানা ও সম্পদ ব্যবহারের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
১৯৬৭ সালের জাতিসংঘের আউটার স্পেস ট্রিটি অনুযায়ী কোনও দেশ চাঁদের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করতে বা সেটিকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে মালিকানা নিতে পারে না।
তবে চাঁদে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি চুক্তিতে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। বেসরকারি মহাকাশ কার্যক্রম অবশ্য সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের অনুমোদন ও তত্ত্বাবধানের অধীন।
ফলে চাঁদের পানি বা অন্যান্য সম্পদ ভবিষ্যতে কীভাবে আহরণ ও ব্যবহার করা যাবে, সে বিষয়ে এখনও বেশ কিছু আইনি প্রশ্নের স্পষ্ট সমাধান হয়নি।
এর আগে কারা চাঁদের বরফ খুঁজেছে?
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফের সন্ধানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক দেশ অভিযান চালিয়েছে।
২০২৩ সালে রাশিয়া লুনা-২৫ মহাকাশযান পাঠিয়েছিল। এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ মেরু এলাকায় জমাট পানি বা বরফের সন্ধান করা। কিন্তু চাঁদের কাছে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিধ্বস্ত হয়। ফলে মিশনটি কোনও বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি।
অন্যদিকে একই সময়ে ভারতও চাঁদের দক্ষিণ মেরু নিয়ে অভিযান চালায়। ভারতের চন্দ্রযান-৩ ২০২৩ সালের আগস্টে সফলভাবে চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে।
মিশনটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুর পৃষ্ঠে মাটির তাপমাত্রা পরিমাপ করে এবং সেখানে পানির বরফ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রমাণ সংগ্রহ করে।
দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ এত কঠিন কেন?
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন। এর প্রধান কারণ হলো অঞ্চলটির দুর্গম ভূপ্রকৃতি।
এখানে অসংখ্য গহ্বর, খাড়া ঢাল এবং গভীর খাদ রয়েছে। ফলে মহাকাশযানের নিরাপদ অবতরণের জন্য সমতল জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এর পাশাপাশি চাঁদের বিষুবীয় অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ মেরু অনেক বেশি দুর্গম। অতীতে চাঁদের যেসব এলাকায় মনুষ্যবাহী অ্যাপোলো অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, সেগুলোর তুলনায় দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
চ্যাং’ই-৭ কেন আলাদা?
চ্যাং’ই-৭-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে কাছাকাছি এলাকা পরীক্ষা করবে না; বরং দক্ষিণ মেরুর গভীর ও অন্ধকার গহ্বরগুলোর ভেতরেও অনুসন্ধান চালানোর চেষ্টা করবে।
বিশেষ করে ছয় পা-ওয়ালা হপারটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এটি গভীর ছায়াচ্ছন্ন গহ্বরের মধ্যে লাফিয়ে প্রবেশ করতে পারে এবং পরে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
সাধারণ রোভার যেসব দুর্গম গহ্বরে পৌঁছাতে পারবে না, হপার সেসব এলাকায় গিয়ে পানির বরফ ও অন্যান্য সম্ভাব্য সম্পদের সন্ধান চালাবে।
এ ধরনের কাজে আগে কোনও মহাকাশ মিশনে আলাদা করে তৈরি ‘হপার’ ব্যবহার করা হয়নি।
চাঁদে ভবিষ্যৎ ঘাঁটির পথ খুলবে কি?
চ্যাং’ই-৭-এর সাফল্য শুধু চীনের মহাকাশ কর্মসূচির জন্য নয়, পুরো মানবজাতির ভবিষ্যৎ চন্দ্র অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে সহজে আহরণযোগ্য বরফের সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। পানি, অক্সিজেন ও রকেটের জ্বালানি তৈরির উপকরণ স্থানীয়ভাবে পাওয়া গেলে পৃথিবী থেকে সবকিছু বহন করে নেওয়ার প্রয়োজন কমবে।
আর যদি চ্যাং’ই-৭ সত্যিই চাঁদের গভীর, অন্ধকার গহ্বরের ভেতর থেকে পানির বরফের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে চাঁদকে শুধু গবেষণার গন্তব্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ গভীর মহাকাশ অভিযানের জ্বালানি ও সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও আরও বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।
সেই অর্থে চ্যাং’ই-৭-এর লক্ষ্য শুধু চাঁদে পানি খোঁজা নয়- এটি ভবিষ্যতে মানুষ কতটা দূর মহাকাশে যেতে পারবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছে। সূত্র: আল-জাজিরা
কিউএনবি/অনিমা/২২ অগাস্ট ২০২৬/দুপুর ২:৩৮