আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এবং শতভাগ আমদানি-বিকল্প বা ‘স্যাংশন প্রুফ’ যাত্রীবাহী বিমান এমসি-২১ এবং আঞ্চলিক এসজে-১০০ এর সফল পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে রাশিয়া।
এই পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন কয়েক দিন আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সাইবেরিয়ার ইরকুতস্ক এভিয়েশন প্ল্যান্ট আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেন এবং প্রকল্পটির অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে বিমান শিল্পে নিজেদের সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল করতে রোস্টেকের অধীন ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট করপোরেশন (ইউএসি) এই মাইলফলক অর্জন করে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নিজস্ব বেসামরিক উড়োজাহাজ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে নতুন রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে এই পদক্ষেপ নেয় রাশিয়া।
দেড় ঘণ্টার সফল পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন
ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, ইরকুতস্ক এভিয়েশন প্ল্যান্টের রানওয়ে থেকে উড্ডয়নের পর এমসি-২১-৩১০ বিমানটি ১ ঘণ্টা ২৩ মিনিট আকাশে ছিল।
এ সময় বিমানটি ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার গতিবেগ অর্জন করে এবং ৬ হাজার মিটার (প্রায় ১৯ হাজার ৭০০ ফুট) উচ্চতায় উড়ে।
পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শেষে প্রধান পরীক্ষামূলক পাইলট রোমান তাসকায়েভ বলেন, “গণউৎপাদন লাইনে তৈরি প্রথম বিমানটি অত্যন্ত ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে এবং নির্ধারিত ফ্লাইট পরিকল্পনা পুরোপুরি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।”
১৮টি বিমান তৈরির প্রস্তুতি
ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ভাদিম বাদেখা জানান, ইরকুতস্ক কারখানায় প্রথম ধাপে ১৮টি এমসি-২১ বিমান উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছে।
তিনি বলেন, গত ২৪ জুলাই প্রেসিডেন্ট পুতিনের কারখানা পরিদর্শনের পর সরকার প্রকল্পটির জন্য অতিরিক্ত উৎপাদন আদেশ অনুমোদন করেছে। ওই সফরে পরীক্ষামূলক পাইলটরা এমসি-২১-এর ফ্লাইট পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রেসিডেন্টকে বিস্তারিত অবহিত করেন।
দীর্ঘ বিলম্বের পর অগ্রগতি
২০০৯ সালে এমসি-২১ প্রকল্প চালু করা হলেও শুরুতে ২০১৬ সাল থেকেই এর গণউৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, বিদেশি যন্ত্রাংশের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সেসব যন্ত্রাংশের দেশীয় বিকল্প তৈরিতে বিলম্বের কারণে প্রকল্পটির সময়সূচি বারবার পিছিয়ে যায়।
তবে প্রকল্পের নির্মাতাদের দাবি, বর্তমানে এমসি-২১ সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ায় উৎপাদিত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে।
এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের বিকল্প হওয়ার লক্ষ্য
এমসি-২১-৩১০-এ রাশিয়ার নিজস্ব পিডি-১৪ টার্বোফ্যান ইঞ্জিন, দেশীয় অ্যাভিওনিক্স, কম্পোজিট উপাদান এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
রাশিয়ার লক্ষ্য, এই বিমানকে দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর জন্য এয়ারবাস এ৩২০ এবং বোয়িং ৭৩৭ সিরিজের কার্যকর বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো।
বছরের শেষেই সার্টিফিকেশনের লক্ষ্য
রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা শিল্পগোষ্ঠী রোস্টেক, যার অধীনে ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট করপোরেশন পরিচালিত হয়, জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এমসি-২১-এর পূর্ণাঙ্গ সার্টিফিকেশন সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
এর কয়েক মাস পরই বিমানটির বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এমসি-২১ প্রকল্পের প্রধান নকশাবিদ ভিতালি নারিশকিন বলেন, পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন চলাকালেই সমান্তরালভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার ফলে সার্টিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পর বিমান সরবরাহ শুরু করতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
তার ভাষায়, “পরীক্ষা ও উৎপাদন একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার ফলে সার্টিফিকেশন পাওয়ার পর গ্রাহকদের কাছে বিমান সরবরাহ শুরু করার ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।”
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও আত্মনির্ভরতার পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, এমসি-২১ শুধু একটি নতুন যাত্রীবাহী বিমান নয়; এটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়ার শিল্প সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতারও বড় পরীক্ষা।
যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সার্টিফিকেশন সম্পন্ন হয় এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী গণউৎপাদন শুরু করা যায়, তাহলে রাশিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে বিদেশি নির্মাতাদের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। পাশাপাশি দেশটির দীর্ঘমেয়াদি বিমান শিল্প কৌশল বাস্তবায়নেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। সূত্র: মস্কো টাইমস
কিউএনবি/অনিমা/০৩ অগাস্ট ২০২৬,/রাত ৮:৪০