আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রতিরক্ষা খাতে দ্রুত স্বনির্ভরতার পথে এগোচ্ছে ভারত। বাজেট বাড়ানো, দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গবেষণা ও উৎপাদনে জোর দিয়ে সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানিতে ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছে দেশটি।
গত এক দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। একই সময়ে রপ্তানিতেও এসেছে বড় অগ্রগতি।
পরিসংখ্যান বলছে, ‘আইডেক্স’ ও ‘অদিতি’র মতো সরকারি উদ্ভাবনী প্রকল্পের ওপর ভর করে সামরিক প্রযুক্তিতে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে নয়াদিল্লি। এরই ধারাবাহিকতায় গোলাবারুদের ক্ষেত্রে দেশটির সেনাবাহিনী ৯১ শতাংশ স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সামরিক আমদানিকারক ভারত এখন রেকর্ড ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি টাকার সামরিক সরঞ্জাম বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও দেশীয় উৎপাদনে ধারাবাহিক জোর দেওয়ার ফলেই ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে এই পরিবর্তন এসেছে।
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের মোট প্রতিরক্ষা উৎপাদন রেকর্ড এক লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। এটি পূর্ববর্তী বছরের ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি রুপি থেকে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। পাঁচ বছর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে এই উৎপাদন ছিল ৮৪ হাজার ৬৪৩ কোটি রুপি। অর্থ্যাৎ তা এখন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
প্রতিরক্ষা বাজেটের ক্রমাগত প্রবৃদ্ধিই মূলত এই বড় সাফল্য অর্জনে সহায়তা করেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ভারতের এই খাতের বাজেট তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়েছে। প্রতিরক্ষা বাজেটের এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অর্থ সরাসরি সামরিক সরঞ্জামের আধুনিকীকরণে ব্যয় করা হয়। বাজেটের পরিচালন ব্যয়ের পরিবর্তে এটি সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখে।
ভারতের প্রতিরক্ষা খাতের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে রপ্তানি বৃদ্ধিতে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যেখানে রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৮৬ কোটি টাকা, তা ৫৬ গুণ বেড়ে গত অর্থবছরে ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর আগের বছরের ২৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকার তুলনায় এটি ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। বর্তমানে ভারতের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে পৌঁছাচ্ছে।
বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশ এখন বিশেষভাবে দৃশ্যমান। মোট রপ্তানির মধ্যে ১৭ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা বা ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। অন্যদিকে, সরকারি সংস্থাগুলো জোগান দিয়েছে ২১ হাজার ৭১ কোটি টাকা বা ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। একসময় সম্পূর্ণ সরকারনিয়ন্ত্রিত এই খাতে এমন পরিবর্তন বড় মাইলফলক।
সামগ্রিক উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বেসরকারি খাতের অংশ দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে মোট উৎপাদনের ৭৬ শতাংশ আসছে সরকারি সংস্থাগুলো থেকে। তবে বেসরকারি খাতের অবদান সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।
রণপ্রস্তুতি ও স্বনির্ভরতার কৌশলগত লাভ
এই বিকাশ কেবল কাগুজে পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সশস্ত্র বাহিনীর রণপ্রস্তুতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায় সংঘাতের সময়ে দ্রুত গোলাবারুদ সরবরাহ ও ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামত করা সহজ হচ্ছে। এর ফলে বিদেশ থেকে সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরতা কমে আসছে।
পূর্ব ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্বজুড়ে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের গুরুত্ব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। অবরুদ্ধ পরিস্থিতি বা নিষেধাজ্ঞার যুগে খুচরা যন্ত্রাংশ ও অস্ত্রের সংকট এড়াতে দেশীয় সক্ষমতার বিকল্প নেই।
ক্রয়নীতিতে সংস্কার ও বড় চুক্তি
সরকারের নতুন ক্রয়নীতি ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতকে ঢেলে সাজিয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ (ডিএসি) স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ব্যবস্থার ‘অ্যাকসেপ্টেন্স অব নেসেসিটি’ (এওএন) অনুমোদন দিয়েছে।
এর মধ্যে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকায় ৯৭টি তেজাস এমকে-১এ যুদ্ধবিমান এবং ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় ১৫৬টি যুদ্ধ হেলিকপ্টার কেনার অনুমোদন অন্যতম। ২০১৬ সালের প্রতিরক্ষা ক্রয়নীতি এবং ২০২০ সালের প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পদ্ধতি স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল। এরপর প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পদ্ধতি ২০২৬ স্থানীয় নকশা ও যন্ত্রাংশ ব্যবহারে অধিক জোর দিচ্ছে।
‘আইডেক্স’ ও ‘অদিতি’ প্রকল্প
ছোট উদ্ভাবক ও স্টার্টআপগুলোকে প্রতিরক্ষা শিল্পে যুক্ত করতে ‘আইডেক্স’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের অধীনে ৬৭৬টি স্টার্টআপ ও ছোট প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ৫৫১টি নকশা ও উন্নয়ন চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।
পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি উন্নয়নে ৭৫০ কোটি টাকার ‘অদিতি’ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (টিডিএফ) অধীনে ৮০টি প্রকল্পে ৩৩৪ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া গভীর ও উদীয়মান প্রযুক্তির জন্য আরও ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল রাখা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও তাদের ১৩৪টি অংশীদার সংস্থাকে দুই হাজার ১৮০টি প্রযুক্তির লাইসেন্স দিয়েছে। এছাড়া দুই হাজার ৭৮০টিরও বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বত্ব তারা স্থানীয় শিল্পের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করেছে। পাশাপাশি ‘পজিটিভ ইন্ডিজেনাইজেশন লিস্ট’-এর মাধ্যমে ৫ হাজার ৫২১টি সরঞ্জাম কেবল দেশীয় বাজার থেকেই কেনার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণা ও প্রযুক্তির নতুন দুয়ার
২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এটি ১১২ শতাংশেরও বেশি বেড়ে ২৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে গবেষণার ২৫ শতাংশ বাজেট বেসরকারি খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এরই ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে বাস্তব ক্ষেত্রে। বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনী গোলাবারুদের ক্ষেত্রে ৯১ শতাংশ স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। তাদের ব্যবহৃত ১৭৫ ধরনের গোলাবারুদের মধ্যে ১৫৯টিই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক ডিজি আর্টিলারি পি শঙ্করের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনার সামরিক সক্ষমতাই কোনো দেশের শক্তির মাপকাঠি। দেশীয় প্রযুক্তিতে এই সক্ষমতা গড়ে তোলা রাষ্ট্রগুলোই যুদ্ধে জয়ী হয়ে বিশ্বমঞ্চে পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
কিউএনবি/অনিমা/২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ৯:৫৪