আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চলতি সপ্তাহে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতোগলু। একই সঙ্গে তিনি দল ‘ফিউচার পার্টি’ বিলুপ্ত করার কথা জানিয়েছেন। ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির(একেপি) অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা দাভুতোগলু পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের অন্যতম সমালোচকে পরিণত হন।
দাভুতোগলু রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার পেছনে দেশটির নোংরা রাজনৈতিক পরিবেশকে এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্থানীয় সময় বুধবার(২৯ জুলাই) এক্সে দেওয়ার পোস্টে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী লেখেন, এটি কোনো পরাজয় মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। এটি নৈতিকভাবে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত। এটি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং এটি সবার প্রতি রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান।
তিনি আরও লিখেছেন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব আমাদের নৈতিক মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ণ করছে। দুর্নীতি বিষয়ক পরিস্থিতির অবনতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
দাভুতোগলু বলেন, রাজনীতিবিদদের দল পরিবর্তনের বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে ওঠা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে সরকারি ট্রাস্টি বা ‘কায়্যুম’ নিয়োগের প্রথা এসবই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০১৮ সালে প্রবর্তিত রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা কর্তৃত্ববাদের পথ প্রশস্ত করেছে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করেছে।
দাভুতোগলুর কর্মজীবনের সময়রেখা
শিক্ষাজীবন
১৯৫৯ সালে তুরস্কের মধ্যাঞ্চলীয় শহর কোনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী দাভুতোগলু ইস্তাম্বুলের বোসফরাস বিশ্ববিদ্যালয়ে (যা বোগাজিসি বিশ্ববিদ্যালয় নামেও পরিচিত) রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বসফরাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন।
একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন। ১৯৯০ সালে তিনি মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন; সেখানে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর নেতৃত্ব দেন।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইস্তাম্বুলের মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ’-এ প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি ইস্তাম্বুলের তুর্কি মিলিটারি একাডেমি এবং ওয়ার একাডেমিতে অতিথি প্রভাষক হিসেবে পাঠদান করেন।
১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ইস্তাম্বুলের বেকেন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান ছিলেন এবং একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি গবেষক (ভিজিটিং স্কলার) হিসেবেও পাঠদান করেছেন। তিনি ইংরেজি ও তুর্কি ভাষায় পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বেশ কয়েকটি বই রচনা ও প্রকাশ করেছেন।
একেপি-তে যোগদান এবং রাজনৈতিক দূরদর্শী হিসেবে তার ভূমিকা
২০০২ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির(একেপি) ক্ষমতায় আসার পর তিনি দলটিতে যোগ দেন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা হন। এরদোয়ানের ক্ষমতায় আরোহণের সময় দাভুতোগলু তার অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন এবং একেপি-র অধীনে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি গঠনে সহায়তা করেছিলেন।
২০০০-এর দশকে গৃহীত তুরস্কের ‘প্রতিবেশীদের সঙ্গে শূন্য সমস্যা’ বিষয়ক পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই নীতির লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও বলকান অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য জোরদার করা এবং সংঘাত কমিয়ে আনা।
২০১১ সালে সিরিয়ায় গণঅভ্যুত্থানের পর বাশার আল-আসাদের সরকারের বিরোধী বিদ্রোহীদের সমর্থন করার বিষয়ে তুরস্কের নীতি নির্ধারণে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, নৈতিকভাবে এটিই সঠিক পদক্ষেপ। তবে সিরিয়া যুদ্ধের মাধ্যমে তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগে ওই অঞ্চলের অনেকের সমালোচনার মুখেও পড়েছিলেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সময়কাল
দাভুতোগলু ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; ২০১৪ সালে এরদোয়ান প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে এই দুই নেতার মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে শুরু করে।
২০১৫ সালের আগস্টে দাভুতোগলু এরদোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর ২০১৫ সালের জুনের নির্বাচনে একেপি পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। যা ২০০২ সালে ক্ষমতায় আসার পর দলটির জন্য প্রথম বড় ধরনের বিপর্যয় ছিল।দাভুতোগলু নির্বাচনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল যথাক্রমে রিপাবলিকান পিপলস পার্টি(সিএইচপি) এবং ন্যাশনলিস্ট মুভমেন্ট পার্টি(এমএইচপি)-র সঙ্গে জোট গঠনের আলোচনা করেন। তবে কোনো দলের সঙ্গেই তিনি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি।
২০১৬ সালে দাভুতোগলু ও এরদোয়ানের রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জেরে সৃষ্ট বিরোধের ফলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দাভুতোগলুর স্থলাভিষিক্ত হন বিনালি ইলদিরিম। সে সময় একেপি-র সংসদীয় দলের প্রধান নুরেত্তিন ক্যানিকলি আল-জাজিরাকে বলেছিলেন, সমস্যা হলো প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সীমা কোথায় শুরু বা শেষ হয়, সে বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই।
তিনি আরও বলেন, যদিও তারা খুব ভালো বন্ধু এবং একই রাজনৈতিক পটভূমির মানুষ তবুও বিভিন্ন বিষয়ে তাদের ভিন্ন মত থাকাটা স্বাভাবিক। যখন তারা একই সময়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলেন তখন তারা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হন।
ফিউচার পার্টি গঠন
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দাভুতোগলু একেপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে নিজস্ব একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। আঙ্কারায় সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, একটি নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা জাতির প্রতি আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
এর আগে একেপি তাকে দল থেকে বহিষ্কারের লক্ষ্যে শৃঙ্খলা কমিটির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দল ছাড়ার আগের মাসগুলোতে দাভুতোগলু একেপির বিরুদ্ধে মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিযোগ তোলেন এবং সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও খোদ এরদোয়ানের কঠোর সমালোচনা করেন।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আঙ্কারায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দাভুতোগলু ‘ফিউচার পার্টি’ চালু করেন; একেপির বিকল্প হিসেবে তিনি এই দলকে একটি রক্ষণশীল অথচ গণতন্ত্রপন্থী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তবে দলটি নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয় এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাত্র ০.১১ শতাংশ ভোট পায়।
সূত্র: আলজাজিরা।
কিউএনবি/অনিমা/৩১ জুলাই ২০২৬,/রাত ৯:২৫