আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি ক্রমেই বেশি অনুকূল মনোভাব দেখাচ্ছেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে কিয়েভের প্রতিরোধ সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প।
সোমবার মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের ধারণা ছিল, রাশিয়ার সামরিক বাহিনী শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনকে পরাজিত করবে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবং ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধ অব্যাহত থাকায় সেই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। এখন তিনি পুতিনকে আগের তুলনায় ‘কম অনুকূল দৃষ্টিতে’ দেখছেন।
ট্রাম্প পুতিনকে জানিয়েছেন, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চান। এর পেছনে উভয় পক্ষের বিপুলসংখ্যক হতাহতের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন তিনি।
এদিকে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তিতে দেশটির অগ্রগতিতে মুগ্ধ হয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের ড্রোন হুমকির মুখোমুখি হয়েছিল, ইউক্রেনীয় বাহিনীও একই ধরনের ইরানি শাহেদ ড্রোনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এ বিষয়টি ট্রাম্পের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প সাধারণত বিজয়ীদের পছন্দ করেন। তার দৃষ্টিতে জেলেনস্কি এখন ক্রমেই সেই ‘বিজয়ী’দের একজন হয়ে উঠছেন।
জুলাইয়ে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে তুরস্কে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকেও ট্রাম্পের বক্তব্যে এ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ওই সময় তিনি বলেন, ‘আমরা আসলে একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছি। এটা বিশ্বাস করা কঠিন, তাই না?’
ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির সম্পর্কের এই পরিবর্তন বেশ নাটকীয়। গত বছর ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে ‘স্বৈরশাসক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তার নেতৃত্বের সমালোচনা করার পাশাপাশি ওভাল অফিসে জেলেনস্কির সঙ্গে প্রকাশ্য বিতর্কেও জড়িয়েছিলেন তিনি। এমনকি একপর্যায়ে ইউক্রেনের সঙ্গে মার্কিন সামরিক সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
অক্টোবরে ওয়াশিংটনে তাদের সর্বশেষ বৈঠকের পর মঙ্গলবার আবারও হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে জেলেনস্কির। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
তবে ট্রাম্পের এই পরিবর্তিত মনোভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের অবস্থান দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। অতীতে পুতিনও ট্রাম্প ও তার কয়েকজন উপদেষ্টার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন বলে তারা মনে করেন।
এদিকে চলতি মাসের শুরুতে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কথা জানান। একই সঙ্গে ইউক্রেনের সঙ্গে ড্রোন উৎপাদনে সহযোগিতার সম্ভাবনার কথাও বলেন তিনি।
সামরিক ড্রোন উৎপাদনে ইউক্রেন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। ২০২২ সালে দেশটি বছরে প্রায় ৫ হাজার ড্রোন উৎপাদন করলেও ২০২৬ সালে সেই সক্ষমতা বেড়ে কয়েক মিলিয়নে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ট্রাম্পকে মুগ্ধ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য যে ধরনের ড্রোন হুমকি তৈরি হয়েছে, ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা সেই একই ধরনের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেন যুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থানে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। জেলেনস্কির সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা এবং পুতিনের প্রতি তুলনামূলকভাবে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন-মস্কো ও ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
কিউএনবি/অনিমা/২৮ জুলাই ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:২৭