আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হয়ে কিউবার গুয়ানতানামো বে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ইয়েমেনি লেখক ও সাবেক বন্দি মনসুর আদায়ফি। তার দাবি, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর নামে মুসলিমদের আটক, নজরদারি ও নির্যাতনের যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা ২৫ বছর পরও পুরোপুরি বিলীন হয়নি; বরং সেই কাঠামো এখন নতুন লক্ষ্যবস্তু তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত এক লেখায় নিজের দীর্ঘ বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এসব কথা বলেন আদায়ফি। তিনি জানান, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার সময় তিনি আফগানিস্তানে ছিলেন। এর কয়েক দিন পর একটি বেসরকারি সংস্থার সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার সময় সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাকে অপহরণ করে।
আদায়ফির ভাষ্য, পরে তাকে এক আফগান যুদ্ধবাজের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই ব্যক্তি তার মুক্তির বিনিময়ে এক লাখ মার্কিন ডলার দাবি করেছিলেন। এরপর তাকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে আল-কায়েদার নেতা হওয়ার অভিযোগ আনা হলেও তিনি দাবি করেন, সে সময় তিনি কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য ছিলেন না এবং আফগানিস্তানে গবেষণার কাজে গিয়েছিলেন।
‘নির্যাতন করে গুয়ানতানামোতে পাঠানো হয়’
আদায়ফি জানান, কান্দাহারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে আটক থাকার সময় তাকে ও অন্য বন্দিদের মারধর ও অপমান করা হতো। ২০০১ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে প্রায় ১০০ বন্দিকে সেখানে রাখা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন সেনারা বন্দিদের নামের পরিবর্তে নম্বর ধরে ডাকতে শুরু করে। তাকে একটি তাঁবুতে নিয়ে গিয়ে পোশাক খুলে ফেলা, শরীরের চুল কামিয়ে দেওয়া, মারধর ও অপমান করা হয়। পরে তাকে কমলা রঙের পোশাক, জুতা, মোজা ও টুপি পরিয়ে হাত-পায়ে শিকল পরানো হয়।
আদায়ফি বলেন, তার গলায় ‘আমাকে মারো’ লেখা একটি চিহ্ন ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চোখ ও কান ঢেকে তাকে বিমানে তোলা হয়। বিমানে ওঠার পরও বন্দিদের মারধর ও অপমান করা হয়। দীর্ঘ যাত্রাপথে হাত-পায়ের শিকল এতটাই শক্ত করে বাঁধা ছিল যে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
গুয়ানতানামোতে প্রথম দিন
গুয়ানতানামোতে পৌঁছানোর পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন আদায়ফি। তাকে নগ্ন করে শরীরে পানি ও সাবান ঢেলে রুক্ষ ব্রাশ দিয়ে ঘষা, একাধিকবার তল্লাশি এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর তাকে একটি খাঁচায় রাখা হয়।
তিনি জানান, খাঁচায় থাকার সময় তার কাছে ছিল একটি প্লাস্টিকের মাদুর, একটি কম্বল, পানির পাত্র এবং দুটি ছোট বালতি। এর একটি পানি রাখার জন্য এবং অন্যটি শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করতে হতো। বন্দিদের বাইরে কারও সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না; ছিল না আইনজীবী বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও।
আদায়ফির বর্ণনা অনুযায়ী, বন্দিদের সঙ্গে সবসময় নম্বর ধরে কথা বলা হতো। তাকে দেওয়া হয় ‘আইএসএন ৪৪১’ নম্বর। তার আগে সিআইএর গোপন বন্দিশিবিরে তার কোনো নম্বরও ছিল না বলে জানান তিনি।
‘আমরা জানতাম না কেন আটক’
গুয়ানতানামোতে থাকা বন্দিদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের মানুষ ছিলেন বলে জানান আদায়ফি। তাদের অনেকেই জানতেন না কেন তাদের সেখানে রাখা হয়েছে এবং কতদিন সেখানে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বন্দিরা আবহাওয়া, উড়োজাহাজের যাত্রার সময় এবং আশপাশের বিভিন্ন চিহ্ন দেখে তারা কোথায় আছেন তা অনুমান করার চেষ্টা করতেন। কেউ বলতেন ওমান বা বাহরাইন, কেউ ভারত। এমনকি নামাজের সময় কোন দিকে মক্কা রয়েছে, সেটিও তারা নিশ্চিতভাবে জানতেন না বলে জানান তিনি।
আদায়ফির দাবি, বন্দিদের অনেককে বলা হয়েছিল তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন, কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
‘প্রায় ৮০০ মুসলিম পুরুষ ও শিশু সেখানে গিয়েছেন’
আদায়ফি বলেন, গুয়ানতানামোতে প্রায় ৮০০ মুসলিম পুরুষ ও শিশু বন্দি হিসেবে এসেছেন। তাদের অনেককে বিভিন্ন দেশের সহযোগী বাহিনী আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছিল বলে তার দাবি।
তার মতে, এসব বন্দিকে ‘সবচেয়ে ভয়ংকর’ সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। গুয়ানতানামোকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য একটি ‘পরীক্ষাগার’ এবং নির্যাতন ও অনির্দিষ্টকালের আটক ব্যবস্থার একটি নকশা হিসেবে বর্ণনা করেন।
আদায়ফি আরও বলেন, গুয়ানতানামোর পাশাপাশি সিআইএ বিভিন্ন দেশে গোপন বন্দিশিবির পরিচালনা করেছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ব্যবস্থায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারও সহযোগিতা করেছিল।
২০১৫ সালে মুক্তির অনুমোদন, মুক্তি ২০১৬ সালে
আদায়ফি জানান, বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে প্রতিষ্ঠিত পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা বোর্ড ২০১৫ সালে তাকে গুয়ানতানামো থেকে স্থানান্তরের অনুমোদন দেয়। তবে অনুমোদনের পরও তাকে আরও প্রায় নয় মাস কারাগারে থাকতে হয়।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় তাকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বন্দি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল এবং এমনকি ‘চিরস্থায়ী বন্দি’ হিসেবেও শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালের ১১ জুলাই তাকে গুয়ানতানামো থেকে বের করে বিমানে তুলে দেওয়া হয়।
ইয়েমেনে তখন যুদ্ধ চলায় এবং মার্কিন কংগ্রেসের বিধিনিষেধের কারণে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়নি। তার বদলে সার্বিয়ায় পাঠানো হয়। আদায়ফির দাবি, সার্বিয়ার সঙ্গে তার কোনো পারিবারিক, ভাষাগত বা ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিল না এবং তিনি সেখানে যেতে রাজিও ছিলেন না।
‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের কাঠামো এখনো আছে’
নিজের লেখায় আদায়ফি বলেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর যুক্তরাষ্ট্র যে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু করেছিল, তার প্রভাব আফগানিস্তান ও ইরাকের বাইরে গিয়েও পড়েছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নজরদারি, ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ, সন্দেহভাজনদের তালিকাভুক্ত করা এবং অভিবাসননীতিতে কঠোরতার উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মুসলিমদের ঘিরে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা কাঠামো পরে উগ্র ডানপন্থীদের জন্যও একটি প্রস্তুত ব্যবস্থা তৈরি করে দেয়। তিনি বলেন, মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সন্দেহ ও বৈরিতার যে ভাষা তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনেও ব্যবহৃত হয়েছে।
আদায়ফি আরও দাবি করেন, বর্তমানে মুসলিমদের বাইরেও বিভিন্ন প্রতিবাদী ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সমালোচনা বা ভিন্নমতও অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
‘২৫ বছর পরও বিচার হয়নি’
আদায়ফির ভাষ্য, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ২৫ বছর পরও গুয়ানতানামো কারাগার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তিনি দাবি করেন, সেখানে আটক অধিকাংশ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি বা নিয়মিত আদালতে বিচার হয়নি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যুদ্ধের নামে বিশ্বজুড়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের ন্যায়বিচারের দাবি কোথায়?
আদায়ফি বলেন, ২৫ বছর ধরে চলা ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুধু একটি যুদ্ধ ছিল না; এর মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা মানুষকে অপরাধ প্রমাণের আগেই সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।
তার ভাষায়, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ যে কাঠামো তৈরি করেছিল, তা অদৃশ্য হয়ে যায়নি; বরং সময়ের সঙ্গে নতুন লক্ষ্যবস্তুর দিকে তা সম্প্রসারিত হয়েছে।
কিউএনবি/আয়শা/১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/বিকাল ৪:৪৪