রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২০ অপরাহ্ন

অতি চালাকের গলায় দড়ি

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
  • ১৭২ Time View
আন্তর্জাতিক ডেস্ক  : সিনেমার চিত্রনাট্যও এতটা নিখুঁতভাবে লেখা সম্ভব হয় না। ২০ বছর বয়সী সিয়া গোয়েল আর তার প্রেমিক ২২ বছর বয়সী চেতন চৌধুরী মিলে কীভাবে এমন একটি ক্রাইম থ্রিলার ভাবলেন, সেটা ভেবেই অবাক তদন্ত কর্মকর্তারা। পুলিশ তদন্তে যতই এগোচ্ছে, কেতন আগরওয়াল হত্যাকাণ্ডে ততই নতুন নতুন বিস্ময়কর সব উপাখ্যান বেরিয়ে আসছে।গত ফেব্রুয়ারিতে পুনের ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালের সাথে সিয়া গোয়েলের বাগদান হয়। আগামী নভেম্বরে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিয়া ভালোবাসতেন চেতন চৌধুরীকে। দুজন মিলে ঠিক করেন, কেতন আগরওয়ালকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবেন। মে মাসের শেষদিকে তারা হত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন। এ নিয়ে দুজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলেছেন। পুলিশ দেখেছে, গত ৭ মাসে সিয়া আর চেতন ২ হাজার ৪ বার ফোন কলে ২৩৮ ঘণ্টা কথা বলেছেন। কীভাবে কেতনকে হত্যা করবেন, তা চূড়ান্ত করতে তারা গুগলের সাহায্যও নিয়েছেন। আলোচনায় তারা লোহাগড় দুর্গকেই হত্যার স্পট হিসেবে চূড়ান্ত করে। তারা দুজন লোহাগড় পরিদর্শন করে হত্যার রিহার্সালও করেন।

প্রথমে ৩১ মে সিয়া আর কেতন লোহাগড় দুর্গ ভ্রমণ করেন। কিন্তু তখন লোকজনের ভিড় থাকায় একা একা সিয়া কিছু করার সাহস বা সুযোগ পাননি। পরে ৪ জুন আবার তারা লোহাগড় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, কেতনের মা তখন তাদের যেতে দেননি। এ নিয়ে সিয়া কেতনের সাথে অনেক রাগারাগিও করেছেন। এরপর সিয়া কেতনকে নিয়ে লোহাগড়ে যান ১৪ জুন। সেদিন সিয়া কেতনকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। কিন্তু ঝোপঝাড় আঁকড়ে ধরে প্রাণে বেঁচে যান কেতন। সিয়া তখন ‘সাপ, সাপ’ বলে চিৎকার করে কেতনকে জড়িয়ে ধরে বলেন, সাপ থেকে বাঁচাতে তিনি কেতনকে সরাতে চেয়েছিলেন। ১৮ জুন আবার লোহাগড় যেতে চাইলে কেতনের মা বাধা দেন। কিন্তু সিয়া নিজের জন্মদিনের কথা বলে কেতনের মাকে রাজি করান।

১৮ জুন হত্যা পরিকল্পনা কার্যকর করতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেন সিয়া-চেতন। এবার আর কোনো ঝুঁকি নেননি। ১৮ জুন সকালে তারা পুনের একটি ক্যাফেতে বসে পরিকল্পনার খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করেন। এরপর সিয়া কেতনের গাড়িতে লোহাগড় চলে যান। আর চেতন বসেন তার পরিকল্পনা নিয়ে। শুধু হত্যা নয়, হত্যা পরবর্তী সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া, পুলিশের চোখ ফাঁকি দেয়ার কৌশল, নিজেদের সন্দেহমুক্ত রাখার চেষ্টা- সব ছিল তাদের পরিকল্পনায়। এমনকি কোনো কারণে ধরা পড়ে গেলে পুলিশকে তারা কী বলবেন, সেটাও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিয়েছিলেন সিয়া আর চেতন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চেতন সকাল ৭টায় তার মোবাইল ফোনের ডাটা অফ করে দেন, ‍যাতে জিপিএস ট্র্যাকারে গতিবিধি অনুসরণ করা না যায়।

আরও সাবধানতার অংশ হিসেবে তিনি তার ফোনটি দোকানে রেখে জরুরি যোগাযোগের জন্য এক কর্মচারীর ফোন নিয়ে যান। আর দোকানের লোকজনকে বলে যান, যাতে ফোন আসলে তারা ধরে কথা বলেন। ফোন চালু রেখে এবং দোকানে রেখে চেতন বোঝাতে চেয়েছিলেন, তিনি পুনেতেই আছেন, বাইরে কোথাও যাননি। পুনে থেকে লোহাগড়ের দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। দীর্ঘ এপথ চেতন পাড়ি দিয়েছেন স্কুটারে। গাড়ি ব্যবহার করলে টোল প্লাজার সিসিটিভিতে প্রমাণ থাকবে। তাই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি গাড়ির বদলে স্কুটার ব্যবহার করেছেন। লোহাগড় পৌছে তিনি ২০/৩০ ফুট পেছন থেকে সিয়া ও কেতনকে অনুসরণ করেন। তার পরণে ছিল শর্টস, মাথায় ছিল হুডি, তারওপর হেডফোন ঝোলানো।

হত্যার ৩৪ মিনিট আগে সিয়া চেতনকে ফোন করে চূড়ান্ত সিগন্যাল দেন। তাদের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল, লোকজন নেই, আগেই নির্ধারিত এমন একটি স্পটে গিয়ে সিয়া পানি খাওয়া বা জুতার ফিতা বাঁধার অজুহাতে বসে যাবেন; তখনই চেতন চৌধুরী কেতনকে ধাক্কা দেবেন। চূড়ান্ত সিগন্যাল হিসাবে সিয়ার বসে যাওয়ার পেছনেও তাদের যুক্তি ছিল। ধাক্কা খেয়ে কেতন বাঁচার সহজাত আকুতি থেকে পাশে থাকা সিয়াকে আকড়ে ধরতে চাইবেন। তাতে সিয়ার প্রাণও ঝুকিতে পড়তে পারতো। তাই সিয়াকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতেই তাকে বসে গিয়ে সিগনাল দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সিয়া ‘বাঁচাও বাঁচাও‘ বলে চিৎকার করলে এক নিরাপত্তা রক্ষী ছুটে আসেন। তিনি প্রথম পুলিশে খবর দেন। আর সিয়া কেতনের মাকে ফোন করে দুর্ঘটনার কথা জানান। 

মনে সন্দেহ থাকলেও কেতনের পরিবার প্রথমে তার মৃত্যুকে দুর্ঘটনা হিসেবেই মেনে নিয়েছিল। থানায়ও প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হয়েছিল। বুকে পাথর চাপা দিয়ে পরিবার কেতনের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে। কিন্তু সবাই বিশ্বাস করলেও কেতনের বোন সানজানা আগরওয়ালের সন্দেহ কিছুতেই যায়নি। অভিজ্ঞ ট্র্যাকার একমাত্র ভাইয়ের চারদিনের ব্যবধানে দুইবার পড়ে যাওয়ার ঘটনা মানতেই পারেননি সানজানা। ঘটনার তিনদিন পর ২১ জুন সিয়া কেতনের বাসায় আসলে সানজানা তার কাছে থেকে সেদিনের ঘটনা জানতে চান। সিয়ার কথায় অসংলগ্নতা ছিল, যা সানজানার সন্দেহ আরো গাঢ় করে। সানজানা সন্দেহের কথা পরিবারকে জানান। সেদিনই কেতনের বাবা বিশাল আগরওয়াল লোহাগড় দুর্গে যান। 

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তারও মনে হয়েছে, এখান থেকে পা পিছলে পড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তখনই তারা পুলিশকে সন্দেহের কথা জানান। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে সিয়া-কেতনের পেছনে হুডি পরা তরুণকে দেখে সন্দেহ করে। ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হুডি পরাটাই ছিল সন্দেহজনক। সেই সন্দেহ থেকে খুঁজতে খুঁজতে চেতন পযন্ত পৌছায় পুলিশ। নিজের কৌশলের ফাঁদে নিজেই ধরা খেয়ে যান চেতন।

সন্দেহ থেকে পুলিশ নিশ্চিত হয় চেতনের আরেক কৌশলের কারণেই। ১৮ জুন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা ৪০ পর্যন্ত চেতনের মোবাইল ডাটা অফ ছিল। এই বয়সের একটা ছেলের মোবাইল ডাটা ১০ ঘণ্টা ৪০ মিনিট অফ থাকাটাও সন্দেহজনক। আর এই সময়ে চেতনের মোবাইলে আসা সব কল অন্য কেউ ধরেছে, এটাও পুলিশের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য চেতন যে কৌশল নিয়েছিল, সেখানেই চোখ পরেছে পুলিশের। এ যেন বজ্র আঁটুনি, ফোসকা গেরো!

১৪ জুন প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলেও ১৮ জুন দ্বিতীয় চেষ্টায় সিয়া আর চেতন কেতনকে হত্যা পরিকল্পনায় সফল হন। তবে কোনো কারণে দ্বিতীয় চেষ্টা ব্যর্থ হলেও তাদের ‘প্ল্যান সি’ তৈরি ছিল। হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সফল হওয়ার পর পর সিয়া ও চেতন তাদের কথোপকথনের সব ইতিহাস মোবাইল থেকে মুছে ফেলেন। এমনকি রিসাইকেল বিন থেকেও মুছে ফেলা হয়। অবশ্য পুলিশ তাদের মোবাইল ফরেনসিকে পাঠিয়েছে মুছে ফেলা ডেটা পুনরুদ্ধারে।   

লোহার বাসর ঘর বানিয়েও রক্ষা পায়নি লক্ষিন্দর। সিয়া-চেতনের নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনায়ও ছিদ্র খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। ভাইয়ের প্রতি বোনের ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত পুলিশকে হত্যা রহস্য উদঘাটনে সহায়তা করেছে। সিনেমার মত বাস্তবেও শেষ পর্যন্ত ভিলেন পরাজিত হয়, সত্যেরই জয় হয়।

কিউএনবি/অনিমা/৩০ জুন ২০২৬,/রাত ১১:১৭

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit