সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৪৬ অপরাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় মধ্যস্থতা করে পাকিস্তানের লাভ কতটা?

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
  • ৪৩ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সুইজারল্যান্ডের বারগেনস্টক শহরের পাহাড়ি রিসোর্টে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জাসিম আল থানি একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কয়েক মিটার দূরে ছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।

বক্তব্য দেওয়ার সময় ভ্যান্স মুনিরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আসিম মুনির যখন এপ্রিলে ইসলামাবাদে আমাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন, তখন আমি মজা করে বলেছিলাম-আমার জীবনে দু’জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আছেন। একজন ভারতীয়, অন্যজন পাকিস্তানি। ভারতীয়জন আমার স্ত্রী, আর পাকিস্তানিজন ফিল্ড মার্শাল মুনির।”

ভ্যান্সের এই মন্তব্যে উপস্থিতদের মধ্যে হাসির সৃষ্টি হয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, গত তিন মাসে তিনি অন্য যেকোনও ব্যক্তির তুলনায় মুনিরের সঙ্গে বেশি আলোচনা করেছেন। তার ভাষায়, “তার কূটনৈতিক দক্ষতা ও সামরিক নেতৃত্ব ছাড়া আমরা এখানে পৌঁছাতে পারতাম না।”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এর আগে মুনিরের ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন।

তবে শুধু ওয়াশিংটন নয়, তেহরানও পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে রাষ্ট্রীয় সফরে যান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর এটি ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। সফরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে পাকিস্তানের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান।

গত কয়েক মাসে পাকিস্তান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। দেশটি গোপন যোগাযোগ সহজ করেছে, ইসলামাবাদে আলোচনার আয়োজন করেছে এবং একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কূটনৈতিক ঝুঁকি সামলেছে।

১৮ জুন ঘোষিত শান্তি কাঠামো এবং বর্তমানে চলমান ৬০ দিনের আলোচনা প্রক্রিয়ার পেছনে পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এখন ইসলামাবাদের সামনে বড় প্রশ্ন- এই কূটনৈতিক সাফল্য থেকে পাকিস্তান বাস্তবে কী লাভ করতে পারবে?

অর্থনৈতিক সুবিধার সম্ভাবনা
দুর্বল অর্থনীতির জন্য পাকিস্তানের সামনে যেকোনও অর্থনৈতিক সুবিধাই গুরুত্বপূর্ণ।

গত অর্থবছরে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে। বাজেট ঘাটতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিসংখ্যানের আড়ালে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

লাহোরভিত্তিক অর্থনীতিবিদ হিনা শেখ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় পাকিস্তানের অর্থনৈতিক লাভ সীমিত হতে পারে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমে যাওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প আবার আলোচনায় আসা।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নতির বড় অংশ এসেছে তেলের দাম ও আমদানি ব্যয় কমার কারণে, উৎপাদন খাতের বড় ধরনের সম্প্রসারণের কারণে নয়।

পাকিস্তান বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ২০২৪ সালে অনুমোদিত এই কর্মসূচি দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের উন্নত সম্পর্ক বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, তবে কেবল কূটনৈতিক সুনাম দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান করবে না।

পাকিস্তানের প্রধান সমস্যা হিসেবে রয়েছে দুর্বল কর ব্যবস্থা, সীমিত রফতানি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতা।

হিনা শেখ বলেন, “কূটনৈতিক সম্পর্ক পাকিস্তানকে কিছুটা সময় ও সুযোগ দিতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে অভ্যন্তরীণ সংস্কার দ্রুত করতে হবে।”

আঞ্চলিক সুবিধার হিসাব
পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রকৃত লাভ সরাসরি অর্থনৈতিক সহায়তার চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা হলে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত বাণিজ্য বাড়তে পারে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান সীমান্ত দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সীমিত থাকা বাণিজ্য কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় হতে পারে।

এছাড়া নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে বহু বছর ধরে স্থগিত থাকা ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প আবার সামনে আসতে পারে।

তবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রভাবেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সৌদি আরবভিত্তিক কিং ফয়সাল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের গবেষক উমর করিম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের সংকটের সময় পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তার মতে, “পাকিস্তান এমন একটি অবস্থানে ছিল যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- দুই পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিল। পাশাপাশি মিসর, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশটি মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছে।”

তবে তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রভাব এখনও এতটা শক্তিশালী নয় যে, দেশটি ইরানকে বড় ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে বা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের দাবি মেনে নিতে চাপ দিতে পারে।

সবচেয়ে বেশি লাভবান কে?
এই কূটনৈতিক সাফল্যের আরেকটি দিক নিয়েও আলোচনা চলছে-কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে?

বারগেনস্টকে ভ্যান্সের বক্তব্যে বিশেষভাবে আসিম মুনিরের প্রশংসা করার বিষয়টি নজর কেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক মাসে পাকিস্তানের সবচেয়ে দৃশ্যমান সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান হলো দেশটির সামরিক বাহিনী।

পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রায় ৮০ বছরের ইতিহাসে তিন দশকেরও বেশি সময় সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। বর্তমানে দেশটির রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।

সমালোচকদের মতে, মুনির কার্যত দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখছেন।

তবে দেশের অভ্যন্তরে প্রশ্ন রয়েছে- এই কূটনৈতিক সাফল্যের অর্থনৈতিক সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে কি না।

বিশেষ করে বেলুচিস্তান প্রদেশের দিকে নজর রয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, উন্নয়ন সংকট এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের সমস্যা রয়েছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, বেলুচিস্তানের মানুষ যদি অর্থনৈতিক সুবিধা পায়, তাহলে সেখানকার সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা সহজ হবে।

তিনি বলেন, “আমরা বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তবে অতীতে অনেক সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।”

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় পাকিস্তানের ভূমিকা দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। তবে এই কূটনৈতিক সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে কি না- সেটিই এখন বড় পরীক্ষা। সূত্র: আল-জাজিরা

 

কিউএনবি/অনিমা/২৫ জুন ২০২৬,/সকাল ৮:৩১

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

August 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit