আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কেউ জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাথরুমে, কেউ আবার হুইলচেয়ারে বসেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন। বুধবার সকালে দিল্লির মালব্য নগরের ফ্লুরিশ স্টে বিএনবি হোটেলে লাগা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিয়েছে ২১টি তাজা প্রাণ। এর মধ্যে ১২ জনই বিদেশি নাগরিক। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির মাঝেও কিছু হৃদয়বিদারক দৃশ্য ও স্থানীয়দের বীরত্বের কাহিনী নাড়া দিয়ে গেছে সবাইকে।
হোটেলটির একটি বাথরুমের দরজা ভেঙে উদ্ধারকারীরা যা দেখলেন, তা দেখে কেঁদেছেন খোদ ফায়ার সার্ভিসকর্মীরাও। বাথরুমের কমোডটির ওপর বসেছিলেন এক নারী, আর পাশের একটি চেয়ারে বসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তার সঙ্গী। দুজনেই মারা গেছেন।
উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ শোয়েব জানান, ওরা আগুনে পুড়ে মরেননি। দমবন্ধ হয়ে মারা গেছেন। সম্ভবত আগুন ও তাপ থেকে বাঁচতে তারা বাথরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি, বিষাক্ত ধোঁয়ায় কালো হয়ে গিয়েছিল তাদের শরীর।
অন্য একটি ঘরে বিছানার কোনায় বসা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এক দম্পতির নিথর দেহ, যারা আগুনে সম্পূর্ণ ঝলসে গিয়েছিলেন। বেসমেন্টের রিসেপশনের কাছে উদ্ধার হয় বছর পঁচিশের এক তরুণী এবং তার ঠিক পাশেই হুইলচেয়ারে বসা এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির দগ্ধ শরীর।
ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি যান আসার আগেই নিজেদের জীবন বাজি রেখে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন শোয়েব, আফজাল, ওয়াসিম ও আশরাফদের মতো স্থানীয় যুবকরা। কোনো সুরক্ষাকবচ ছাড়াই ধোঁয়ায় দমবন্ধ হওয়া বিল্ডিংয়ের ভেতর ঢুকে পড়েন তারা।
হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মী আশরাফ খান বলেন, ভেতরে মেঝেতে ভাঙা টাইলস ছড়িয়ে ছিল, ধোঁয়ায় চোখ মেলাই দায়। আমরা বিছানার চাদরে করে মানুষজনকে ধরাধরি করে নামিয়ে আনছিলাম। পায়ে কাচ ও পাথর ফুটে রক্তারক্তি হয়ে গিয়েছিল।
অন্যদিকে, বাইরেও চলছিল মরিয়া উদ্ধারপ্রয়াস। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, পাঁচ তলার ছাদে এক বিদেশি নাগরিক একটি খুঁটি ধরে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। ওপর থেকে মানুষকে লাফ দিতে উৎসাহিত করতে নিচে নিজের দোকান থেকে ২০-২২টি তোষক এনে রাস্তায় বিছিয়ে দেন রিয়াজুদ্দিন মনসুরি ও তার ছেলে আরমান। এতে অনেকের প্রাণ বাঁচলেও রিয়াজুদ্দিনের প্রায় ২ লক্ষ রুপির ক্ষতি হয়েছে। তবে তার সাফ কথা, মানবতার খাতিরে এই ক্ষতি কিছুই নয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, শর্ট সার্কিট থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত। তবে এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর পেছনে রয়েছে হোটেলের চরম গাফিলতি। পুলিশ জানিয়েছে, হোটেলটির কোনো ফায়ার এনওসি বা অগ্নিনির্বাপণ ছাড়পত্র ছিল না। মাত্র ৬টি ঘর চালানোর অনুমতি থাকলেও বেআইনিভাবে ২৫টি ঘর চালানো হচ্ছিল।
বহুতল ভবনটিতে জরুরি বা ইমার্জেন্সি এক্সিট ছিল না। ওঠানামার একমাত্র সিঁড়িটিও ছিল একদম মাঝখানে, যা দ্রুত ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। হোটেলের সব জানালা স্থায়ীভাবে সিল করা ছিল এবং প্রধান দরজাটি ছিল সেন্সর-চালিত। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতেই দরজা লক হয়ে যায়।
দুর্ঘটনার সময় অধিকাংশ অতিথিই ঘুমাচ্ছিলেন। ধোঁয়ায় অচেতন অবস্থায় ৫৮ জনকে উদ্ধার করে কাছের ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর পরই ভয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান হোটেলের মালিক লভকেশ বাজাজ। তবে বুধবার রাতেই তাকে গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিশ।
এই ঘটনা দিল্লির হোটেলগুলোর অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি আবারও প্রকাশ্যে এনে দিল। সূত্র : এনডিটিভি।
কিউএনবি/অনিমা/০৫.০৬.২০২৬/রাত ১০:৩১