আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শত্রুদের প্রতি এক কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন, তেহরান কখনোই যুদ্ধ চায় না, তবে দেশের ওপর কোনো আগ্রাসন চাপিয়ে দেওয়া হলে নিজেদের রক্ষার্থে তার চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো সফরের প্রসঙ্গ টেনে আরাগচি বলেন, এই অঞ্চলের দেশগুলোকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনে যদি ওইসব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করা হয়, তবে ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সরাসরি সেই ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। এ সময় অঞ্চলের তথাকথিত মার্কিন ‘নিরাপত্তা ছাতা’ বা সুরক্ষার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের এই সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে সুরক্ষার বদলে কেবলই নিরাপত্তাহীনতা বয়ে এনেছে।
সাক্ষাৎকারে ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ওপর ভয়াবহ হামলা চালায়, তখন তিনি স্বয়ং সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির দফতরে উপস্থিত ছিলেন। যুদ্ধের সেই চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তার চেয়ে দেশের সর্বোচ্চ নেতার নিরাপত্তা নিয়েই তিনি বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। হামলার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দুই দিন পর্যন্ত তিনি নেতার ভাগ্য নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ছিলেন। আরাগচি জানান, সামরিক কর্মকর্তারা সে সময় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে একটি নিরাপদ আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকারে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। শহীদ এই সর্বোচ্চ নেতা তখন বলেছিলেন, ইরানের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তিনি নিজে কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে যাবেন না; দেশের জনগণের ভাগ্যে যা ঘটবে, তার ভাগ্যেও ঠিক তা-ই ঘটবে। আরাগচি একে একজন প্রকৃত নেতার দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেন, যিনি কেবল শাসন করেননি বরং মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন।
নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরাগচি স্পষ্ট করেন যে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনির অধীনে ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক কাঠামো সম্পূর্ণ সুসংগঠিত রয়েছে। তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকার মাধ্যমে দেশের সার্বিক কর্তৃত্ব নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন এবং জাতীয় বিষয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছেন। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকে নিয়মিত এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে দিকনির্দেশনা আসছে এবং সরকারি কর্মকর্তারা তা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করছেন। শহীদ নেতার প্রতি ইরানি জনগণের যে আনুগত্য ও ভালোবাসা ছিল, তা বর্তমান নতুন নেতার প্রতিও পূর্ণমাত্রায় বজায় রয়েছে এবং এই ক্রান্তিকালে এই জাতীয় ঐক্যই ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি। নিরাপত্তাজনিত কারণে বর্তমান নেতার জনসমক্ষে আসা সীমিত রাখা হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তার সরাসরি অংশগ্রহণ এবং সম্পৃক্ততা অত্যন্ত জোরালো।
আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পুনরুল্লেখ করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স-এর প্রতি তেহরানের নীতিগত সমর্থন সর্বদা বজায় থাকবে। চলমান সংঘাতের অবসানে যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি হতে হলে তা লেবাননসহ সব ফ্রন্টকে অন্তর্ভুক্ত করেই হতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান কখনোই লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি, বরং একে একটি ভ্রাতৃপ্রতীম রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে। আগ্রাসী শক্তিগুলো মনে করেছিল প্রতিরোধ যোদ্ধাদের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে আন্দোলনকে দুর্বল করা যাবে, কিন্তু বাস্তবে তা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ তাদের মিত্ররা ইরানের তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী প্রতিরোধক্ষমতা দেখে বিস্মিত হয়েছে। ইরান তার কৌশলগত অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী এবং সংঘটিত সমস্ত যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে বলেও জানান আব্বাস আরাগচি।
সূত্র: প্রেস টিভি
কিউএনবি/অনিমা/০৫.০৬.২০২৬/বিকাল ৫.১৬