আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুরা অভিযোগ করেছেন যে, তাদের ওপর হামলা, জোর করে কাপড় খুলে নেয়া, শরীরের ভেতরের অংশে অপমানজনক ও কষ্টদায়ক তল্লাশি করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ইসরাইলিরা নিজেদের যৌনাঙ্গ প্রকাশ করেছে, এমনকি শিশুদের সামনেও এবং যৌন সহিংসতার হুমকি দিয়েছে।
গত তিন বছরে ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টিয়াম প্রকল্পের গবেষকরা যৌন সহিংসতার ১৬টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। এ ধরণের গবেষণায় লজ্জা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই সহিংসতার তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে আসল সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। এই গবেষণায় অংশ নেয়া সংস্থাগুলো বলেছে, যৌন সহিংসতা ব্যবহার করা হচ্ছে মানুষকে ভয় দেখাতে, যাতে তারা নিজেদের বাড়ি ও জমি ছেড়ে চলে যায় এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন বদলে যায়।
গত রোববার (১৯ এপ্রিল) প্রকাশিত ‘সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স অ্যান্ড ফোর্সিবল ট্রান্সফার ইন দ্য ওয়েস্ট ব্যাংক’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে ২০২৩ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর যৌন নির্যাতন ও অপমানজনক আচরণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। আরও যেসব নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে— ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রস্রাব করে দেয়া, হাত-পা বাঁধা ও কাপড় খুলে ছবি তুলে তা ছড়িয়ে দেয়া, টয়লেট ব্যবহার করা নারীদের পিছু নেয়া এবং ধর্ষণের হুমকি দেয়া।
এই ধরনের নির্যাতনের কারণে অনেক ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। জরিপে অংশ নেয়া পরিবারের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বলেছে, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা সহিংসতা—বিশেষ করে মেয়েদের যৌন হয়রানি—তাদের এলাকা ছাড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষ বলেছে যে এই যৌন হয়রানি তাদের ভয়কে ‘সহ্যসীমার বাইরে’ নিয়ে গেছে। তারা নিজেদের পরিবার, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের অপমানিত হতে দেখছে এবং ভবিষ্যতে আরও খারাপ কিছু ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ আছে, ইসরাইলি সেনারা উপস্থিত থাকলেও তারা এই নির্যাতন থামায়নি বা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।
একজন নারীর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে—দুইজন নারী সৈন্য তার বাড়িতে ঢুকে তাকে জোর করে কাপড় খুলতে বলে এবং শরীর তল্লাশি করে, যেখানে তাকে অপমান করা হয় এবং ব্যক্তিগত স্থানে স্পর্শ করা হয়। পুরুষ ও ছেলেদেরও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। যেমন ২৯ বছর বয়সি এক ফিলিস্তিনি যুবককে কাপড় খুলে মারধর করা হয় এবং তার যৌনাঙ্গে প্লাস্টিকের বন্ধনী লাগানো হয় এবং এটা করা হয় সবার সামনেই।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে একটি গ্রামে কিছু ফিলিস্তিনিকে কাপড় খুলে, হাতকড়া পরিয়ে মারধর করা হয়, তাদের ওপর প্রস্রাব করা হয় এবং একজনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এখানেই শেষ নয়, এসবের ছবি তুলে ছড়িয়ে দেয়া হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
এই পরিস্থিতির কারণে অনেক মেয়ে স্কুল ছেড়ে দিয়েছে এবং নারীরা কাজ করা বন্ধ করেছে, যাতে তারা এমন হামলার ঝুঁকি এড়াতে পারে। এছাড়া পরিবারের লোকজন মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি মেয়েদের বিয়ের ঘটনাও পাওয়া গেছে।
রামাল্লায় নারীদের সহায়তায় কাজ করা উইমেন’স সেন্টার ফর লিগ্যাল এইড অ্যান্ড কাউন্সেলিং জানিয়েছে, এই ধরনের যৌন নির্যাতন ফিলিস্তিনি সমাজকে ভেঙে দিচ্ছে এবং মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করছে।
এই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নারীরা তল্লাশির সময় যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, সৈন্যরা মেয়েদের সামনে নিজেদের শরীর প্রকাশ করছে, এবং চেকপয়েন্টে তাদের হয়রানি করছে। এমনকি মেয়েদের মাসিক নিয়েও উপহাস করা হয়েছে।
সংস্থার একজন কর্মকর্তা কিফায়া খ্রাইস বলেছেন, মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে না, অল্প বয়সে বিয়ে হচ্ছে, আর নারীরা কাজ হারাচ্ছেন কারণ তারা বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, তারা যে ঘটনাগুলো জানেন, তা মোট ঘটনার খুবই ছোট একটি অংশ—সম্ভবত ১ শতাংশ মাত্র।
ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস–ইসরাইলে’র এক কর্মকর্তা মিলেনা আনসারি বলেছেন, এসব ঘটনার পেছনে দায়মুক্তির একটি সংস্কৃতি কাজ করছে, যেখানে অপরাধীদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে না।
সম্প্রতি একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলা হয়, একটি বন্দিকে ধর্ষণের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সেনাদের বিরুদ্ধে মামলা বাতিল করা হয়েছে—এটি এমন বার্তা দেয় যে এসব অপরাধ সহ্য করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইসরাইলের রাজনীতিতেও এ বিষয়ে বিতর্ক হয়েছে, কিন্তু স্পষ্টভাবে এই ধরনের অপরাধের বিরোধিতা করা হয়নি। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট বলেছেন, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
এই গবেষণায় পশ্চিম তীরের ৮৩টি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। তবে এটি পুরো অঞ্চলের পরিসংখ্যানগত চিত্র নয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী কোনো সাড়া দেয়নি।
কিউএনবি/আয়শা/২১ এপ্রিল ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:১৫