শান্তা ইসলাম,জেলা প্রতিনিধি ,নেত্রকোনা : নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা জনপদ ঘিরে দোলপূর্ণিমার আগমনী সুরে আবারও উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে । পাহাড়ের কোলঘেঁষা চেংগ্নী গ্রামে শুরু হতে যাচ্ছে ১৮১ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী চেংগ্নী মেলা, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকজ সংস্কৃতি এবং গ্রামীণ জীবনের আনন্দ একাকার হয়ে যায়। হাজং সম্প্রদায়ের দোলপূজাকে কেন্দ্র করে দেড় শতাব্দীর ওপর ধরে এই মেলা শুধু একটি আয়োজন নয়।
এটি সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত ইতিহাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস ও আনন্দের গল্প। স্থানীয় জনশ্রুতি বলছে, লেংগুরা ইউনিয়নের গোপালবাড়ি চেংগ্নী গ্রামে হাজং সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে দোলপূজা পালন করে আসছেন। সেই পূজাকে ঘিরেই প্রতিবছর বসে এই মেলা। কালের প্রবাহে ছোট ধর্মীয় আয়োজনটি আজ পরিণত হয়েছে বিশাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে।
এ বছর মঙ্গলবার (৩ মার্চ) বিকেলে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বুধবার (৪ মার্চ) থেকে শুক্রবার (৬ মার্চ) পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী চলবে এই মেলা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত গোপালবাড়ি মন্দিরকে ঘিরে সাজ সাজ রব। রঙিন কাপড়, আলোকসজ্জা এবং উৎসবের আমেজে পুরো এলাকা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পাহাড়, সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য ও খোলা আকাশ সব মিলিয়ে এখানে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে এক অনন্য সৌন্দর্য। দূরে দেখা যায় ভারতের মেঘালয় পাহাড় শ্রেণি, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ না করে পারবে না।
মেলায় ইতোমধ্যেই বসতে শুরু করেছে বাহারি দোকান। কোথাও বাঁশ ও কাঠের তৈরি আসবাবপত্র, কোথাও রঙিন তৈজসপত্র, আবার কোথাও নিপুণ হাতে তৈরি লোকজ শিল্পকর্ম। গ্রামবাংলার ঘরের কাজে প্রয়োজনীয় নানা জিনিস কিনতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। শিশুদের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে মেলার একাংশ। নাগরদোলায় চড়ে শিশুদের উচ্ছ্বাস, খেলনার দোকানে তাদের আগ্রহ সব মিলিয়ে মেলার প্রাণ যেন এখানেই। পাশাপাশি নানা ধরনের খাবারের দোকান মেলার আনন্দকে আরও রঙিন করে তুলেছে।
এই মেলা শুধু চেংগ্নী গ্রামের নয়; নেত্রকোণা জেলা ও সুনামগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন। কারও কাছে এটি ধর্মীয় অনুভূতির জায়গা, কারও কাছে প্রকৃতি দেখার সুযোগ। আবার কারও কাছে গ্রামীণ মেলার হারিয়ে যাওয়া আনন্দ ফিরে পাওয়ার ঠিকানা। মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি প্রণব হাজং বলেন, দোলপূজা উপলক্ষে প্রতিবছরই এই মেলার আয়োজন করা হয়। এবার ১৮১তম চেংগ্নী মেলা।
দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে। মেলার সুষ্ঠু আয়োজন ও নিরাপত্তায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা সহযোগিতা করবেন। পাহাড়, পূজা আর মানুষের মিলনমেলায় চেংগ্নী মেলা তাই কেবল একটি আয়োজন নয়। এটি কলমাকান্দার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
কিউএনবি/আয়শা/০২ মার্চ ২০২৬,/বিকাল ৫:২০