মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ১১:২৮ পূর্বাহ্ন

বড় চ্যালেঞ্জে শিক্ষা খাত

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৭ Time View

ডেস্ক নিউজ : দেশে পাসের হার ও জিপিএ ৫ বাড়লেও শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। শিক্ষার্থীদের পাঠদক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও বাস্তব প্রয়োগ ক্ষমতায় বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অঙ্গনে বাংলাদেশের ডিগ্রির মান অবনমনেরও খবর আসছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় দেখা যায়, ডবল জিপিএ ৫ পেয়েও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী পাস পর্যন্ত করতে পারে না। এতে শিক্ষার মানের অবনমনের বিষয়টি স্পষ্ট। সব মিলিয়ে দেশের শিক্ষা খাত এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুুখে। এ অবস্থায় নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

নতুন সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ববি হাজ্জাজ। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ডা. মাহদী আমিনকেও এই দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষা খাতকে এগিয়ে নিতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা। এরই মধ্যে শিক্ষা খাতে তিন অগ্রাধিকারের কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। সেগুলো হলো—শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, জাতীয় কারিকুলাম রিভিউ ও পরিমার্জন এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন। পাশাপাশি ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচিও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া ১৮০ দিনের রোডম্যাপের মাধ্যমে কোন পর্যায়ে কিভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

বিশ্বব্যাংকের গত বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একটি শিশু ১৮ বছর বয়সে সাধারণত ১১ বছর মেয়াদি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করে (প্রথম শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণি)। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা শেখার মান বিবেচনায় এর মধ্যে কেবল ৬.৫ বছরের সমতুল্য শিক্ষাই অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশ অন্তত ৪.৫ বছর পিছিয়ে আছে। অর্থাৎ আমাদের দেশের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মান সপ্তম শ্রেণির সমমানের, যা শিক্ষার গুণগত দুর্বলতার একটি বড় প্রমাণ।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল না। ছিল না বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা। ফলে মান কমে গেছে। শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার মধ্যে নেই। আর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষাঙ্গনে এখনো অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আমি মনে করি, শিক্ষা খাতের বিশৃঙ্খলা টেনে ধরাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মানের ধস ঠেকাতে যা যা করণীয়, তা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরাতে হবে, পুরনো শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষাকে কর্মমুখী করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য বন্ধ করা ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, শিক্ষক সংকট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল বৈষম্য এবং পুরনো পাঠ্যক্রমে পড়ালেখা অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া প্রশাসনিক অদক্ষতা, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, উচ্চশিক্ষায় গবেষণার অভাব, শিক্ষার্থীদের মনোস্বাস্থ্য ও ঝরে পড়ার হার শিক্ষা খাতকে বাধাগ্রস্ত করছে। কারিগরি শিক্ষার পেছনে গত ১৭ বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা যায়নি। ফলে আগের মতো এই খাত পুরোপুরিই অবহেলার মধ্যে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার একটানা দায়িত্ব পালন করলেও তারা শিক্ষার্থীর হার ও পাসের হার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। ফলে যেসব শিক্ষার্থী মানের দিক দিয়ে পিছিয়ে ছিল, তারা হোঁচট খাচ্ছে। আর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরেও রুটিন কাজ করতে করতেই সময় পার হয়েছে। তারা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্দোলন সামাল দিতে দিতেই সময় পার করেছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের কোনো ভাবনাই দেখা যায়নি।  আগের মেয়াদে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষাব্যবস্থায় নকল নির্মূলে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছিলেন এহছানুল হক মিলন। তবে তাঁর সামনে এখন একাধিক চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকার নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করলেও তা শেষ করে যায়নি। ফলে তারা এখন অপেক্ষায় রয়েছে। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিয়েও শিক্ষকদের সঙ্গে করা হয়েছে প্রহসন। অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষকরাও এমপিভুক্তির অপেক্ষা করছেন। কিছু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের দাবি তোলা হয়েছে। সরকারি প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরাও গ্রেড উন্নয়নের দাবিতে অনড় রয়েছেন। 

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শৃঙ্খলা ধরে রাখা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনিয়মের লাগাম টানা শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষায় মানের ক্ষেত্রে গত প্রায় দেড় যুগে বড় ধস নেমেছে। আধুনিক শিখন পদ্ধতির অভাব রয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা—উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ শিক্ষকের তীব্র অভাব রয়েছে এবং গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অবকাঠামোগত দুরবস্থা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা লাভের সুযোগ সব শিক্ষার্থীর সমান নয়, ফলে ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে আর দেশে ফিরছেন না। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং মানোন্নয়ন করা বর্তমান সরকারের নতুন শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নতুন সরকারপ্রধানের দূরদর্শিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে শিক্ষা খাতে। এত দিন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পৃথক মন্ত্রী থাকায় তাঁরা কোনো সিদ্ধান্তে একমত হতে পারতেন না। কিন্তু এবার এই দুই মন্ত্রণালয়ের জন্য একজন মন্ত্রী দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন শিক্ষার মানোন্নয়নে একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী এর বাস্তবায়ন কতটুকু করতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তবে এত দিন শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্তিতে দুর্নীতি, বদলি-পদায়নে অনিয়ম-দুর্নীতি, বই ছাপায় দুর্নীতি, প্রকল্পগুলোয় অস্বচ্ছতা, নিয়োগে দুর্নীতি, পরিদর্শন-তদারকিতে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সেই অনিয়ম-দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে কতখানি বের হয়ে আসতে পারেন, সেটা তাঁদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ‘নতুন শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমরা দেখছি, বিভিন্ন লক্ষ্যের কথা বলছেন। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে আসল কাজ। আমার মনে হয়, খণ্ডিত টার্গেটের চেয়ে একটা সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। শিক্ষার মানোন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকারের পরামর্শক কমিটির সুপারিশও তাঁরা বিবেচনায় নিতে পারেন। আসলে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা দরকার। একই সঙ্গে তা বাস্তবায়নের কৌশলও দরকার। শিক্ষার উন্নয়নে একটি পরামর্শক কমিটিও করতে পারে সরকার।’

সূত্র : কালের কণ্ঠ।

কিউএনবি/অনিমা/২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/সকাল ১০:১২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

August 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit