ডেস্ক নিউজ : বিশ্ব মুসলিমের বহুল প্রতীক্ষিত মাস পবিত্র রমজান। নামাজ, রোজা, দান-সদকা ও আত্মসংযম— এই মৌলিক ইবাদতগুলো সব দেশেই অভিন্ন এবং এতে কোনো ভিন্নতার সুযোগ নেই। তবে দেশ ও সংস্কৃতি ভেদে রমজান পালনের পরিবেশ ও রীতিতে দেখা যায় বৈচিত্র্য। কোথাও ইফতারের সময় কামানের গর্জনে জানান দেওয়া হয়, কোথাও আবার সেহরির আগে ঘুমন্ত রোজাদারদের জাগানো হয় ঢোলের তালে তালে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ছোঁয়ায় রমজান এভাবেই হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক।
১. কামানের গোলায় ইফতারের সময় ঘোষণা
রমজানের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য হলো ইফতারের সময় কামানের গোলার শব্দে জানান দেওয়া। ধারণা করা হয়, এই রীতির উৎপত্তি মিসরে। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে, মাগরিবের আজানের সময় একটি কামানের গোলা ছুড়ে ইফতারের সময় ঘোষণা করা হয়।
ঘড়ি ও লাউডস্পিকারের প্রচলনের আগে কামানের মাধ্যমেই ইফতারের গণঘোষণা দেওয়া হতো। আজও সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, জর্ডান, কাতার ও বাহরাইনে এই ঐতিহ্য টিকে আছে।
২. রঙিন ফানুসে রমজানের বার্তা
মিসরের ঐতিহ্যবাহী রমজান লণ্ঠন—ফানুস—এখন মুসলিম বিশ্বের এক পরিচিত প্রতীক। রমজান এলেই মিসরের ঘরবাড়ি, রাস্তা, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিপণিবিতান সাজানো হয় রঙিন ফানুসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আলোকসজ্জা বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং রমজানের আনন্দ ও উৎসবের আবহ তৈরি করেছে।
৩. সেহরির সময় ঢোল বাজিয়ে জাগানো
সেহরির সময় মানুষকে জাগাতে ঢোল বাজানোর প্রথা শত শত বছরের পুরোনো। আরব দেশগুলোতে যিনি এই দায়িত্ব পালন করেন, তাকে বলা হয় মেসাহারাতি। তুরস্কে তিনি পরিচিত দাভুলচু নামে, আর উপমহাদেশে পরিচিত সেহেরিওয়ালা হিসেবে।
ভোরের আগে তারা ঢোল বাজিয়ে ও ছন্দে ছন্দে ডাক দিয়ে পাড়া-মহল্লা ঘুরে মানুষকে সেহরির জন্য জাগিয়ে তোলেন। তুরস্কে এই ঢোলবাদকেরা প্রায়ই উসমানি আমলের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন। ইন্দোনেশিয়ায় সেহরি ও ইফতারের সময় জানান দিতে ব্যবহৃত হয় বড় ঢোল, যা বেদুগ নামে পরিচিত।
এবার কত ঘণ্টা হবে সৌদি আরবে রোজা?
ঢোলের পাশাপাশি কিছু দেশে সেহরির বার্তা পৌঁছে দেন নগর ঘোষক। মরক্কোয় এদের বলা হয় নাফার। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা চালু হওয়ার আগে তারা পাড়া-মহল্লা ঘুরে রোজা, সেহরি, নামাজের সময়সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিতেন। কোনো কোনো অঞ্চলে এই ভূমিকা মেসাহারাতির সঙ্গে মিলেও যায়।
৫. হাগ আল লায়লা
সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজানের আগে পালিত হয় হাগ আল লায়লা। শাবান মাসের ১৫ তারিখে অনুষ্ঠিত এই উৎসবের মাধ্যমে শুরু হয় রমজানের কাউন্টডাউন। শিশুরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গায় এবং মিষ্টি ও বাদাম সংগ্রহ করে। এই আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে দানশীলতা ও সামাজিক বন্ধনের শিক্ষা দেওয়া হয়।
৬. পূর্বপুরুষের স্মরণ ও সম্মিলিত স্নান
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলমানের দেশ ইন্দোনেশিয়ায় রমজান ঘিরে রয়েছে নানা রীতি। এর মধ্যে অন্যতম নগাবুবুরিত। এতে ইফতারের আগে বিকেলের সময় বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে কাটানো হয়—পার্কে হাঁটা, ধর্মীয় আলোচনা শোনা কিংবা খাবারের দোকানে ভিড় করা এই রীতির অংশ।
জাভা অঞ্চলে রমজানের শেষ দিকে আয়োজন করা হয় তাকবিরান মিছিল। তরুণেরা হাতে লণ্ঠন নিয়ে আল্লাহর প্রশংসায় তাকবির ধ্বনি দিতে দিতে রাস্তায় বের হন।
রমজানের আগে পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারতের রীতি রয়েছে, যা নিয়াদরান নামে পরিচিত। জাকার্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় এটি শ্রদ্ধা ও স্মরণের অংশ হিসেবে পালন করা হয়।
এ ছাড়া রোজা শুরুর এক-দুদিন আগে পাডুসান নামে একটি প্রথা রয়েছে, যেখানে মানুষ প্রাকৃতিক ঝরনা, নদী বা জলাশয়ে সম্মিলিতভাবে গোসল করে আত্মশুদ্ধির অনুভূতি লাভ করে।
৭. চাঁদ রাত
চাঁদ রাত অর্থ চাঁদের রাত। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ঈদুল ফিতরের আগের রাতের একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন। নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে রমজানের সমাপ্তি এবং শাওয়াল মাসের সূচনা হয়।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে মানুষ খোলা জায়গায় জড়ো হয়ে চাঁদ দেখেন, একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। নারীরা মেহেদি লাগান, ঘরে ঘরে তৈরি হয় ঈদের মিষ্টি, আর শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় জমে ওঠে বাজার।
দেশভেদে রমজানের রীতি ভিন্ন হলেও এর মূল চেতনা এক—সংযম, ইবাদত ও মানবিকতা। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মাঝেও পবিত্র রমজান সারা বিশ্বের মুসলমানদের এক সুতোয় বাঁধে।
সূত্র: খালিজ টাইমস
কিউএনবি/আয়শা/০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ৯:১২