এম এ রহিম চৌগাছা (যশোর) : শীত বেড়েছে তাই যশোরের চৌগাছায় বেড়েছে খেজরের গাছে রস। চলতি মৌসুমে উৎপাদন হবে কোটি টাকার গুড়-পাটালী। শীতের তীব্রতা বেড়েই চলেছে বেড়েছে গাছিদের ব্যস্ততা। মাঠে মাঠে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন তারা। প্রতি বছর শীত মৌসুমের শুরুতে এই অঞ্চলের গাছিরা খেজুর গাছ কাটতে শুরু করেন। পুরোদমে রসের পাশাপাশি গুড় বিক্রি শুরু করেছেন। এর মধ্যে গত কয়েকদিন শীত বাড়ায় গাছে রসও বেড়েছে। গাছিরা বলেছেন, এই শীত বাড়লে রস যেমন পরিষ্কার হয়, তেমনি মিষ্টিও বেশি হয়।
খেজুরের রস ও গুড়ের বাজার একসময় ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। এখন অনেকে চিনির বিকল্প হিসেবে খাচ্ছেন গুড়। ফলে শহর এলাকায় বেড়েছে গুড়ের চাহিদা। বিশেষ করে শীতকালে খেজুরের রসের মতো গুড়েরও চাহিদা থাকে ব্যাপক। আর যশোরের রস-গুড় হলে তো কথাই নেই। কারণ যশোরের যশ খেজুরের রস কথাটি ঐতিহ্যবাহী। চৌগাছা অঞ্চলের খেজুরের রস-গুড়ের ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চল খেজুরের রস ও গুড়ের জন্য বিখ্যাত।
চৌগাছা উপজেলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম জানান, এ বছর প্রায় ৫০ হাজার গাছ থেকে রস আহরণ করার কাজ করছেন প্রায় ১৬৪০ জন গাছি। যার থেকে রস পাওয়া যাবে প্রায় ২ কোটি লিটার। এ বছর গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ লাখ মেঃ টন ছাড়িয়ে যাবে।
বুধবার (১৭ জানুয়ারি) উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের নিয়ামতপুর, পাতিবিলা, ও পৌর এলাকার পাঁচনামনা, বেড়বাড়ী গ্রামে গেলে চোখে পড়ে গাছিরা ব্যস্ত গাছ থেকে রস পাড়ার কাজে। ঘন কুয়াশা ঘেরা সকালে গাছে উঠে রসের ভাড় পাড়া থেকে মুক্তি পেতে তারা তৈরি করে নিয়েছেন বাঁশের লম্বা লগা। নিচ থেকে লগায় ভাড়ের দড়িটিকে (কানাচ) আটকে নামাচ্ছেন। সেই রস ভাড়ে ঢেলে আবার ভাড়-ঠিলে টাঙিয়ে দিচ্ছেন গাছের নলিতে। এই সকল মাঠেই রয়েছে শতশত খেজুর গাছ। এছাড়া রাস্তার দুই পাশ ও ক্ষেতের আইলে রয়েছে অসংখ্য খেজুর গাছ।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি বাড়িতে খেজুরের রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরির জন্য চুলা রয়েছে। গুড় তৈরির জন্য বড় কড়াই-তাফাল ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করছেন। চুলার উপরে তাফাল ও কড়াই চাপিয়ে ভাড়ের রস ছেঁকে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। এর পর চুলায় জ্বাল দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়ার পর রসের ঘনত্ব ও রঙ বদলায়। এভাবে তৈরি হয় খেজুর গুড়। যিনি জ্বাল দেন, তিনি বুঝতে না পারলে মুরব্বিদের কাছ থেকে জেনে নেন। ঘনত্ব বুঝে ঝোলা গুড় ও পাটালি তৈরী করেন। এ উপজেলার গ্রামের অধিকাংশ পরিবার কৃষিকাজের পাশাপাশি এই পেশায় জড়িত। এ সময় কথা হয় গাছি আতিয়ার রহমান, ওয়াজ্জেত আলী, শাহিনুর রহমান, আমিনুর রহমান ও মোস্তাক রহমানের সাথে। তারা গাছ থেকে যে যার মতো ভাড় নামিয়ে রস সংগ্রহে ব্যস্ত। রস বাড়ি নিয়ে জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করবেন।
উপজেলার পেটভরা গ্রামের গাছি আশাদুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমের নভেম্বর মাস থেকে গাছ কাটা ও রস সংগ্রহের মৌসুম শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে শীত কম থাকায় রসের পরিমাণ কম ছিল। ফলে রস ও গুড় চাহিদা মতো সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। তবে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শীত বেড়েছে। এতে আগের তুলনায় রসের পরিমাণও বেড়েছে। ফলে রস-গুড়ের স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে লাভের আশাও করছেন তারা।
পাতিবিলা গ্রামের গাছি আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, বাপ-দাদাদের কাছ থেকে খেজুর গাছ কাটা শিখেছি। বছরের অন্যান্য সময় কৃষিশ্রমিকের কাজ করি। শীত মৌসুমে খেজুর কেটে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরী করি। এ পেশা হাড়ভাঙা খাটুনির করতে হয়। সে তুলনায় লাভ কম। এবার আমার গাছের সংখ্যা ৩৫টি। প্রতিদিন পাঁঁচ-ছয় ভাড় রস হয়। প্রতি কেজি গুড় ৩০০ ও পাটলী ৫০০ টাকা বিক্রি হয়। প্রতি ভাড় কাঁচা রস ২০০-২৫০ টাকা বিক্রি হয়। এতে ভালোই আয় হয়। এই পেশায় সরকারের কোন সহযোগিতা নেই। এজন্য অনেকে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। কোন ব্যাংক, এনজিও ও বেসরকারি সংস্থা যদি সহায়তা দিয়ে আমাদের পাশে থাকতো, তাহলে খেজুরের রস-গুড়ের উৎপাদন আরও বাড়ান সম্ভব হতো।
চৌগাছা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মুসাব্বির হোসাইন বলেন, খেজুরের রস সংগ্রহ বাড়াতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে গাছিদের নিয়ে বিভিন্ন গ্রামের উঠান বৈঠক, গাছি সমাবেশ ও গাছিদের মাঝে বিনামূল্যে উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। এ ব্যাপরে যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. সুশান্ত কুমার তরফদার বলেন, এ বছর নিরাপদ খেজুর রস সংগ্রহ এবং গুড়ের উৎপাদন বাড়াতে জেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে গাছিদের প্রশিক্ষণ এবং বিনামূল্যে সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে।
কিউএনবি/আয়শা/১৭ জানুয়ারী ২০২৪,/বিকাল ৫:৩৩