জালাল আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে প্রতিদিন চলে মানবিক ইফতারের আসর। করোনা পরবর্তী সময়ে তিন বছর বন্ধ থাকার পর এই বছর থেকে আবার চালু হয়েছে এ ইফতারের আসর। শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রতিদিন মানবিক ইফতারের আসরে রোজাদারদের ভিড় বাড়ছে। জানা যায়, আজ থেকে ২৫ বছর আগে এই ইফতার আসরের যাত্রা শুরু হয়েছিল।প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট বাজেট থাকে এই মানবিক ইফতারের জন্য।এ বছর মানবিক ইফতারের বাজেট আড়াই লাখ টাকা । প্রতিদিন সাড়ে তিনশ থেকে চারশো লোকের জন্য এখানে ইফতারের আয়োজন করা হয়। ইফতারের আইটেমের মধ্যে ছোলা, শরবত, খেজুর, মুড়ি,পাকুড়া। মাঝে মাঝে কলা ও জিলাপি দেওয়া হয়।
সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে,প্রতিদিন আসরের নামাজের পর ইফতারের আইটেম নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক গণ কেন্দ্রীয় মসজিদের বারান্দায় বসে মুড়ি,পাকুড়া,ছোলা, খেজুর ও জিলাপি নিয়ে আলাদা প্লেটে রোজাদারদের মাঝে বিতরণ করতে থাকে। ইফতারের সময় হলে কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব ও অন্যান্য দায়িত্বরত ব্যক্তিরা এখানে বসে সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একসাথে ইফতার করে। ইফতারের সাথে দেওয়া হয় বিশেষ শরবত।বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অনেকেই কিনে ইফতার করতে পারে না। তাদের বৃহৎ অংশ চলে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের এই মানবিক ইফতারের আসরে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের ছাত্র মাসুদ (ছদ্ম নাম) জানান, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে প্রতিদিন সাহরিতে সময় ভালো খাবার খেতে পারি না ,ইফতারি তো দূরের কথা। তাই প্রতিদিন কেন্দ্রীয় মসজিদের ইফতারের আসরে যোগ দিই।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য মাস্টার্স শেষ করা চাকুরী প্রত্যাশী ফাহিম জানান, অনার্স এবং মাস্টার্স শেষ করলেও এখনো একটা চাকরি ভাগ্যে জোটে নি। তাই এখন বেকার হয়ে অভিশপ্ত জীবন পার করছি। মন চাইলেই রমজানে ইফতারি কিনে খেতে পারি না। তাই কেন্দ্রীয় মসজিদের ইফতারের আসরে চলে আসি।উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রামের বাসিন্দা মোঃ আব্দুল জলিল। থাকেন ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায়। রিকশা চালক জলিল প্রতিদিন ইফতার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের ইফতারের আসরে। তিনি জানান গ্রামে আয় -ইনকামের কোন উৎস নাই। তাই ঢাকা শহরে চলে আসছি। রিকশা চালিয়ে যা আয় হয়,তাতে সংসার চলে না। যেহেতু এখানে ফ্রি তে ইফতার দেওয়া হয়, তাই এখানে বসে ইফতার করি।
পথচারী রবিউল ইসলাম জানান, একদিন কেন্দ্রীয় মসজিদের ফ্রিতে ইফতারের শুনি। এখানে এসে দেখি আসলেই ফ্রি তে ইফতার দেওয়া হয়। তাই এখানে ইফতার করতে আসলাম। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।মন ভরে ইফতার করতে পারলাম।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব ডক্টর সৈয়দ মুহাম্মদ এমদাদ উদ্দিন জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির হৃদপিন্ড এবং বাতিঘর।দেশ ও জাতির কল্যাণ ও উন্নয়নে এটি সবসময় নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুমুখী কল্যাণময় কাজের অন্যতম দিক হলো পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের আয়োজন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ সবসময় এ আয়োজন কে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করেন।এ আয়োজন মূলত ধর্মীয় এবাদত, মানবসম্পদ উন্নয়ন , সামাজিক সম্প্রীতি এবং ভ্রাতৃত্ববোধের অন্যতম উদাহরণ।এ ঐতিহ্যবাহী আয়োজন দিনে দিনে আরো উন্নত এবং প্রসার লাভ করবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, পবিত্র রমজানুল মোবারকের ইফতারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী এবং আশেপাশে অনেক রোজাদার থাকে। তাদের অনেকেই হত দরিদ্র। তাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর তাদেরকে ইফতারের সময় আপ্যায়নের জন্য আমরা এই উদ্যোগ নিয়ে থাকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে এখানে ফ্রেশ খাবার দেওয়া হয়। এটাই আমাদের সবচেয়ে গৌরবের। ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।