স্পোর্টস ডেস্ক : মাইক গাটিংকে করা ওয়ার্নের প্রথম বলটা পড়ল লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে। সেখান থেকে সেই বল টার্ন নিয়ে গিয়ে আঘাত করে অফ স্ট্যাম্পে। স্টেডিয়ামে সবার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময়। এটাও কি সম্ভব? কিন্তু ওয়ার্নের মুখে স্বভাবসুলভ হাসি। এ হাসিতেই তিনি জানান দিয়েছিলেন, ওয়ার্নের দ্বারা এই অসম্ভবও সম্ভব। ওয়ার্নের ওই বলটাকে পরবর্তীতে আখ্যা দেয়া হয় ‘বল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ বা ‘শতাব্দীর সেরা বল’ হিসেবে।
ওয়ার্ন ওই যে শুরু করেছিলেন, এরপর আর থামার নাম নেই। বছরের পর বছর ব্যাটারদের চমকে দিয়ে কখনও উপড়ে ফেলেছেন অফ স্ট্যাম্প, কখনও ফ্লিপারে পাগল করেছেন দর্শকদের। আবার কখনও লেগ স্পিনের জাদুতে ব্যাটারদের ফেলেছেন লেগ বিফোরের ফাঁদে। পেস বোলারদের বিশাল আধিপত্যের সময়টাতে স্পিন বোলিংকে এত জনপ্রিয় করে তোলার অন্যতম নায়ক ছিলেন এই ওয়ার্ন।
তর্কসাপেক্ষে অনেকে ওয়ার্নকে বলেন শতাব্দীর সেরা স্পিনার। হয়তো তিনি তা-ই, অথবা না। কিন্তু ওয়ার্ন স্পিন বোলিং, বিশেষ করে লেগ স্পিনকে ক্রিকেটের যত বড় অস্ত্র হিসেবে দেখিয়ে গেছেন, সেটা মনে রাখতে বাধ্য ক্রিকেট বিশ্ব। ক্রিকেটের মাঠে সবসময় দুর্ভেদ্য এবং অজেয় এই ওয়ার্ন গত বছরের ৪ মার্চ থাইল্যান্ডের একটি দ্বীপে ঘুরতে গিয়ে হুট করেই মারা যান।

বাতাসে তখন গুঞ্জন, ইংল্যান্ডের কোচ হতে পারেন ওয়ার্ন। তবে সেসব গুঞ্জনকে পাত্তা না দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে থাইল্যান্ডে অবকাশ যাপনে গিয়েছিলেন তিনি। কয়েকদিন ভালো উপভোগও করেছিলেন, ৪ মার্চেও ছিলেন বেশ। কোহ সামুইতে রিসোর্টে দুপুর পর্যন্ত ছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। বিকেলে তাদের একসঙ্গে বের হওয়ার কথা। কিন্তু অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো খোঁজ নেই ওয়ার্নের। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে রুমে গিয়ে নক করেন ওয়ার্নের বন্ধুরা। তবে সেখানেও সাড়াশব্দ নেই তার। এরপর দরজা ভেঙেই ঢুকে যান তারা। অজ্ঞান অবস্থায় মাটিতে পড়ে ছিলেন ওয়ার্ন। কিছুক্ষণ কৃত্রিমভাবে নিশ্বাস দেয়ার চেষ্টা করেন তার বন্ধুরা। সেটা না পেরে পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি কিংবদন্তিকে, ৫২ বছরেই ইতি টানেন স্পিন জাদুকর।
ওয়ার্নের মৃত্যুসংবাদে হুট করেই যেন মাথায় বাজ পড়ে সারা বিশ্বের। ক্রিকেট জাদুকর কি তাহলে আর নেই? মাঠে ব্যাটারদের নাচিয়ে বেড়ানো এই জাদুকর এত সহজেই হারিয়ে গেলেন! বিশ্বাস তো কেউই করতে পারেনি। পারেননি সর্বকালের অন্যতম সেরা দুই ব্যাটার শচীন টেন্ডুলকার আর ব্রায়ান লারাও। মাঠের বাইরে যে ওয়ার্নের সঙ্গে দুর্দান্ত বন্ধুত্ব ছিল এই দুই ব্যাটারের। লারা তো বলেই ফেলেছিলেন, ‘ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। এই ক্ষতি কিভাবে পূরণ করবো জানি না।’ শচীন বলেছিলেন, ‘তোমার সঙ্গে মাঠ ও মাঠের বাইরের দুর্দান্ত সেই সময়গুলো সবসময় খুঁজে ফিরব।’

শোক জানিয়েছিলেন বিশ্বের সব প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রায় সবার শোক বার্তাতে একটি কথা প্রায় মিলে যায়, ‘দারুণ প্রাণবন্ত এই লোকটা এভাবে চলে গেলেন’। তবে শুধু ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নন, স্বয়ং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিলেন ওয়ার্নের মৃত্যুতে। অস্ট্রেলিয়ায় ঘোষিত হয় রাষ্ট্রীয় শোক। পাঁচ আঙুলে বল ঘুরিয়ে মানুষের কতটা কাছে পৌঁছা যায়, সেটাই যে পূর্ণরূপে দেখিয়ে গেছেন ওয়ার্ন।
অস্ট্রেলিয়ায় ওয়ার্নের প্রভাব কতটুকু তা বোঝা যায় একটা ঘটনাতেই। ওয়ার্নের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরের মেলবোর্ন স্টেডিয়ামের একটি স্ট্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে তার নামে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কয়েকদিনের ব্যবধানে তা বাস্তবায়নও হয়ে যায়। গ্রেট সাউদার্ন স্ট্যান্ড হয় এসকে ওয়ার্ন স্ট্যান্ড।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোট ১০০১টি উইকেট নিয়েছেন ওয়ার্ন। এরমধ্যে শুধু সাদা পোষাকেই তার উইকেট সংখ্যা ৭০৮টি। ব্যাটেও রান করেছেন চার হাজারের বেশি। তবে পরিসংখ্যান দিয়ে কি ওয়ার্নকে মাপা যায়! হাসিখুশি এক মুখ দিয়েই তো কোটি মানুষকে জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। মারা গেলেও ওয়ার্ন বেঁচে থাকবেন তার শত শত জাদুকরি ডেলিভারির কারণে, সিক্ত হয়ে থাকবেন কোটি ভক্তের ভালোবাসায়। তবে তাও যদি না হয়, অন্তত মার্ক গাটিংকে আউট করা বলটির জন্য ক্রিকেটভক্তদের স্মরণে থাকবেন তিনি।
কিউএনবি/আয়শা/০৪ মার্চ ২০২৩,/বিকাল ৪:৩০