আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দুদিন আগেও কত মনোহরী ছিল তুরস্কের দিয়ারবাকিরের অভিজাত ভবনগুলো। নজর জুড়ানো গঠন। মন ভুলানো নকশা। কি দারুণ দম্ভে আকাশ ছুঁয়ে থাকত শান্তির নীড়গুলো! তারার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জ্বলত অন্দরমহলের ঝাড়বাতিগুলো। এখন ঠিক তার উলটো। মুহূর্তের কম্পনে ধুলোয় মিশে গেছে ইট-পাথর-সিমেন্টের সুউচ্চ পল্লি। মরা হাতির মতো হাড়-গোড় বেরিয়ে পড়ে আছে! ‘ফেলে দেওয়া টিস্যুর মতো দোমড়ানো-মোচড়ানো।’ ধ্বংসস্তূপের জঞ্জালে পরিণত হওয়া বিরাট-বিশাল এ ভবনগুলো দেখে মঙ্গলবার এমন মন্তব্যই করলেন একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক ওজকেন কারাকোক।
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের মধ্যে সোমবার সবচেয়ে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছে তুরষ্কে। মৃতের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। ধ্বংস হয়েছে পাঁচ হাজার ৭০০ বহুতল ভবন। আরব নিউজের এক সাংবাদিকের কাছে ধসে যাও সেসব ভবন নিয়ে কথা বলছিলেন ওজকেন। ২০০ মানুষের বসবাসকারী একটি আটতলা ভবন দেখে নিজেও কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে পড়েন তিনি। ওজকেন বাস করেন দিয়ারবাকিরে সেরানটোপ জেলায়। দিয়ারবাকিরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও দরিদ্র এলাকাগুলোর অন্যতম বাগলার জেলা এক স্কুলের শিক্ষক। ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। জানান, ভূমিকম্পের পর তীব্র ঠান্ডার মধ্যেও শুধুমাত্র পায়জামা পরা অবস্থায় শিশুসহ অনেক মানুষে ভরে উঠেছিল দিয়াবাকিরের রাস্তা। উদ্ধারকৃতদের কম্বল ও খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব প্রদেশ দিয়ারবাকিরে ছুটি কাটাচ্ছিলেন বার্জিন ও তার চাচাতো ভাই স্থানীয় ফুটবল খেলোয়াড় রোজহাত। ভূমিকম্পের আগে নিজ শহর ভ্যানে ফিরে যাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু সোমবার ভোরের ভূমিকম্পে রোজহাত চাপা পড়ে যায় ভবনের নিচে। সেই ধসে পড়া ভবনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিল বার্জিন। রোজহাত উদ্ধারের পর তারা দুজনে আবার ভ্যানে ফিরে আসে, তখন পরবর্তী আফটারশকে ধসে যায় তাদের ভবন। ভূমিকম্পে বেঁচে গিয়েও রেহাই নেই স্থানীয়দের। আরব নিউজের এক সাক্ষাৎকারে বেরজিন বলেন, ভূমিকম্পের পর মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ধসে যাওয়া বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করছিল তারা। ২০১১ সালের ভূমিকম্পের পর যেসব বিল্ডিং সংস্কার করা হয়নি তার মধ্যে একটি তাদের এই বিল্ডিং।
দিয়ারবাকিরের আরেক বাসিন্দা ব্যারেক দেমিরেল জানান, ভূমিকম্পের সময় তিনি ঘুমিয়ে থাকলেও আফটারশকের সময় তিনি স্বামীসহ সন্তানদের নিয়ে বাড়ি থেকে বিরিয়ে যান। বৈরী আবহাওয়াতেও দীর্ঘ সময় বাইরে থাকেন তিনি। তবে ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আবার বাড়িতে ফিরে আসতে হয়েছিল তাকে।
দক্ষিণ হাতায় প্রদেশের একটি শহর ইসকেনদেরুণের মিসেল উয়ার বলেন, ভেতরে থাকা স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীসহ ভেঙে পড়ে একটি হাসপাতাল। শহরটিতে অবস্থিত বন্দরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আধুনিক নির্মাণ ব্যবস্থায় তৈরি ভবনসহ বহু পুরোনো বিল্ডিংও ভেঙে পড়ে এখানে।
উয়ার আরও জানান, সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছে এই অঞ্চলের সব গির্জা। ভূমিকম্পের সময় শরীরে পাথরের আঘাতে প্রাণ হারায় অর্থোডক্স চার্চের পাহারায় থাকা এক পুলিশ সদস্য।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুসারে, গাজিয়ানতেপ প্রদেশের নূরদাগি ২৩ কিলোমিটার পূর্বে সোমবার ভোরে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বে কাহরামানমারাস প্রদেশের কাছে একই দিনে দুপুরের দিকে ৭.৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। সতর্কতা অবলম্বনে দক্ষিণ সিহান রপ্তানি টার্মিনালে তেলের প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।
কিউএনবি/অনিমা/০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩/সন্ধ্যা ৭:৫৩