আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে নজিরবিহীন ও ‘চোখ কপালে ওঠার মতো’ রেকর্ড গড়েছে বিশ্ব আবহাওয়া ও জলবায়ুর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে দেওয়া প্রাকৃতিক ঘটনা ‘এল নিনো’। বছরের শেষভাগে গিয়ে এই সামুদ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ঘটনা সাধারণত চূড়ায় পৌঁছায়। তবে বছরের সেই চরমতম সময়ে পৌঁছানোর আগেই পৃথিবীর আধুনিক আবহাওয়ার অন্তত ১৫০ বছরের সমস্ত রেকর্ড গুঁড়িয়ে দিয়েছে বর্তমান এল নিনো। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী ও পরিবেশ গবেষকমহল একে মহাশক্তিশালী প্রলয়ঙ্করী পরিবেশগত দুর্যোগ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। যা বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটকে আশঙ্কাজনক মাত্রায় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রস্থলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩.০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এই বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৩.০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ছিল গত ১৫০ বছরের রেকর্ডে সর্বোচ্চ। আবহাওয়াবিদদের বহুল ব্যবহৃত আরেকটি পদ্ধতি ‘ওভারঅল নিনো ইনডেক্স’ (ওএনআই), যা ত্রিশ বছরের গড় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে হিসাব করে তৈরি করা হয়, সেখানেও তাপমাত্রা ২০১৫ সালের রেকর্ড ছোঁয়ার মাত্র এক-শতাংশ নিচে অবস্থান করছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানী জেকে হাউসফাদার বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত ১৪টি প্রধান আবহাওয়া মডেল বিশ্লেষণ করে সতর্ক করেছেন, আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের সামুদ্রিক এই উষ্ণতা বৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে পৌঁছাতে পারে। জলবায়ুর ইতিহাসে এই মাত্রার ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা এক প্রকার অভাবনীয় ও ‘মাইন্ড-ব্লোয়িং’ বলে অবিহিত করছেন। আবহাওয়া বিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী মহাসাগরের তাপমাত্রা সাধারণের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি বাড়লে তাকে এল নিনো বলা হয়, তবে এটি ২ ডিগ্রি পেরিয়ে গেলেই তাকে ‘অতি শক্তিশালী’ বা ‘সুপার’ এল নিনো আখ্যা দেওয়া হয়। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানের এই এল নিনো বিগত অন্তত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী ঘটনা হতে চলেছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে মানুষের হাত ধরে পৃথিবী যে গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছিল, বর্তমানের মহাশক্তিশালী এল নিনো সেই উত্তাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। মূলত এই জোড়া ধাক্কার প্রভাবেই আগামী ২০২৭ সাল বিশ্বের আবহাওয়ার যাবতীয় পূর্ববর্তী রেকর্ড ভেঙে দিয়ে ইতিহাসের চরমতম এবং সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে চলেছে। এর ভয়াবহ প্রভাব ইতোমধ্যেই পৃথিবীর একেক প্রান্তের আবহাওয়া বদলে দিতে শুরু করেছে এবং চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে ফেলছে কোটি কোটি মানুষকে। অতীতে ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের সুপার এল নিনো বিশ্বজুড়ে শত শত বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতিসাধন করেছিল। তবে কার্বন ব্রিফের অন্যতম গবেষক জেকে হাউসফাদারের মতে, চলমান এই জলবায়ু আঘাত বিগত সব ঐতিহাসিক ধ্বংসযজ্ঞকেও ছাড়িয়ে যাবে। গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় যেখানে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার, সেখানে ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোয় ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৫.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। আর এখনকার এল নিনো যেহেতু সেই পরিসংখ্যানকেও পেছনে ফেলে গেছে, তাই এর অর্থনৈতিক মাশুল হবে আরও বহুগুণ বেশি।
সামুদ্রিক ও বৈশ্বিক এই শক্তিবিন্যাসকে চরম বিপজ্জনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রিডেরিক অটো। তিনি সতর্ক করে জানিয়েছেন, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলেই জলবায়ু ব্যবস্থার মধ্যে এই ধরনের এক অভূতপূর্ব শক্তি ও উত্তাপের পুনর্বণ্টন ঘটছে। এর ফলে আমরা বিশ্বের বহু জায়গায় এমন তাপদাহ ও চরম আবহাওয়া দেখতে পাব যা মানুষ ইতিপূর্বে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সুপেয় পানির প্রাচুর্যের ওপর। আমরা যতক্ষণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ না করব, এল নিনো প্রতিবার আগের চেয়ে আরও বেশি উত্তপ্ত একটি পৃথিবীর ওপর আঘাত হানবে, যা মোকাবিলা করা মানবজাতির জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইতোমধ্যেই এই প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় তীব্র খরা ও অস্বাভাবিক গরমের কারণে ইতিহাসজুড়ে সবচেয়ে মারাত্মক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেখান থেকে আসা ধোঁয়াশায় বাতাস প্রাণঘাতী মাত্রায় বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। ভারতে প্রয়োজনীয় মনসুন বা বর্ষার বৃষ্টিপাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে খরার কারণে কৃষিক্ষেত্রে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি পানামা খালের পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে নেমে যাওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্য জাহাজ চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। এই দুর্যোগের ফলে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফপি) আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, চলমান পরিস্থিতি বিশ্বের প্রায় ৫ কোটি মানুষকে তীব্র ক্ষুধার দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম পৌঁছাতে পারে লাগামহীন জায়গায়।
অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অন্য অঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যার তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। পেরু ও চিলিতে ইতোমধ্যে ধ্বংসাত্মক বন্যা দেখা গেছে, যার কারণে ঐতিহাসিক মাচু পিচুর পর্যটন পথ পর্যন্ত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। খরা ছাড়াও এল নিনোর দরুন আফ্রিকার শিং অঞ্চল বা হর্ন অব আফ্রিকা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অংশে চরম ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ গোলার্ধের আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম তীব্র শুষ্ক ও উত্তপ্ত হতে চলেছে, যার কারণে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ দাবানল এবং খরা দেখা দেবে। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী টাইফুন বা ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়লেও এল নিনোর প্রভাবে আশ্চর্যজনকভাবে আটলান্টিক মহাসাগরের হারিকেন কিছুটা দমক খেয়ে থামবে।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফিয়ারিক রিলিজের বিজ্ঞানী কেভিন ট্রেনবার্থ মনে করেন, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমরা এখন যে দাবানল ও অস্বাভাবিক তাপদাহ দেখছি তা ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয়ের সামান্য পূর্বাভাস মাত্র। বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন যে মানুষের সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখন এল নিনোকে তীব্রতর করছে এবং বদলে যাওয়া এল নিনো আবার বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে। গাছপালার রিং, প্রবালপ্রাচীর এবং প্রাচীন ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণ করে ভূতাত্ত্বিক যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে বিগত এক সহস্রাব্দে মহাসাগরের তাপমাত্রা এই পর্যায়ে পৌঁছানোর কোনো নজির পাওয়া যায় না।
উদ্ভূত উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দুর্যোগ আসার আগেই তথ্য পৌঁছে দিতে নিজেদের ৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তথ্যসংগ্রহ ও সতর্কীকরণ কার্যক্রম শুরু করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমাদের চোখের সামনেই এল নিনোর এক দানবীয় রূপ বা ‘সুপারসাইজ’ সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। বিজ্ঞান পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে যে পৃথিবী এখন পুরোপুরি অচেনা এবং এক চরম বিপজ্জনক আবহাওয়া অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে মূল লড়াইটি হলো এই চরম ঝুঁকির বিরুদ্ধে কতটা দ্রুত টেকসই জলবায়ু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় এবং মানবজাতিকে রক্ষা করা যায়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক বিল ম্যাগুইয়ার চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে যা ঘটতে চলেছে তা এক কথায় অভূতপূর্ব এবং এটি নতুন হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় আবহাওয়াগত বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হবে, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কিউএনবি/অনিমা/২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ১১:৪১