আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যেখানে একসময় ভালোবাসার ঘর ছিল, সেখানে এখন কেবলই কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ আর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া রডের স্তূপ। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দুলতে থাকা কাঠের সিঁড়িটিতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলে সামনে এগিয়ে যান আলা হেসিস। প্রতি পদক্ষেপে তার ক্লান্তি স্পষ্ট, পেট স্পর্শ করে থাকা ভারী অন্তঃসত্ত্বা রূপ গতিকেও আরও ধীর করেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে তিনি যে জায়গাটিতে দাঁড়ান, সেটি একসময় ছিল তার চার দেয়ালের সংসার। আর এখন সেখানে টাঙানো রয়েছে একটি ত্রিপল বা প্লাস্টিকের তাঁবু। এই ভিটের নিচেই চাপা পড়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে তার তিন সন্তান; দশ বছরের ওয়াসিম, সাত বছরের মুহান্নাদ এবং পাঁচ বছরের খাওলা। এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় পুরো বাড়িটি মাটির সাথে মিশে যাওয়ার সাথে সাথেই প্রাণ হারিয়েছিল এই তিনটি শিশু। সন্তান হারানোর সেই গভীর শোক বুকে চেপে আর মাত্র এক মাস পর আবারও নতুন এক জীবনের জন্ম দিতে যাচ্ছেন আলা।
ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ চার বছরে পদার্পণ করার সাথে সাথে গাজার সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কতটা দুঃসহ এবং বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে, আলার এক দিনের জীবনপ্রবাহ যেন তারই এক করুণ দলিল। গাজার প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় কোনো শান্তির বার্তা নিয়ে নয় বরং চারপাশের অবর্ণনীয় কোলাহল আর দুর্ভোগ দিয়ে। আলার সকালটি শুরু হয় তাঁবুর ভেতরে মাছিদের একটানা ভনভন শব্দ এবং আশপাশের মানুষের কোলাহলে। এই তাঁবুগুলোতে কোনো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা নিরাপত্তার বালাই নেই। একে অপরের নিঃশ্বাসের শব্দ কিংবা স্নানঘরের আওয়াজ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যায়। আলার তাঁবুর যে খোপটি জানালার মতো ব্যবহৃত হয়, তা খোলা মাত্রই সরাসরি দৃষ্টি যায় ইসরায়েলি সামরিক অবস্থানের দিকে। সেখান থেকে প্রায়শই গুলির শব্দ ভেসে আসে, যা যেকোনো মুহূর্তে প্রাণসংহারী হতে পারে।
যুদ্ধের কারণে গাজায় রান্নার গ্যাসের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সকালে একটু চা বানানোর সহজ কাজটিও এখন এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। লাকড়ি কুড়িয়ে এনে খোলা আগুনে আগুন জ্বালিয়ে চা তৈরি এবং সংসারের নিত্যদিনের কাজ সারতেই আলার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যায়। সকালে একটু চা পানের পর তাঁবু গুছিয়ে নিয়ে সূর্য তীব্র হওয়ার আগেই তিনি রান্নার কাজ শেষ করার চেষ্টা করেন। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বরফ-শীতল পানিতে স্বামী ও নিজের কাপড় নিজ হাতে ধোয়া তার জন্য শারীরিকভবে অত্যন্ত কষ্টকর।
দিনের আলো ফোটার পর তাঁবুর পাশের তার্পুলিনের ছিদ্রযুক্ত অংশটি খুলে বাইরে তাকালে কেবল ধ্বংসের হাহাকারই নজরে আসে। চতুর দিকে ভাঙা ইট, কংক্রিট আর পোড়া গন্ধ। এই পরিস্থিতির মধ্যেই নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার জন্য আলাকে পায়ে হেঁটে যেতে হয় দূরবর্তী একটি কেন্দ্রে। ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের প্রখর রোদে গায়ের পোশাক ভিজে যায়, পায়ে হাঁটার রাস্তায় মশার উৎপাত আর ইটের টুকরো। কিন্তু সেখানে পৌঁছে যে স্বাস্থ্যসেবা পান, তাও কোনো হাসপাতাল বা সুসজ্জিত ক্লিনিক নয়; কেবলই আরেকটি তাঁবু। গাজার দীর্ঘদিনের তীব্র খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের প্রভাব আলার শরীরে স্পষ্ট। চিকিৎসকরা তাকে গর্ভাবস্থার জন্য ভিটামিন ও পুষ্টির পরিপূরক বড়ি দিয়েছেন। কিন্তু আলা ভালো করেই বোঝেন, যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে শরীরে যে পুষ্টির অভাব আর অনাহার জমেছে, তা এই সামান্য ওষুধ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। তার স্বামী বাজার থেকে অল্প কিছু ফল বা শাকসবজি কিনে আনলে নিজে না খেয়ে স্ত্রীর পাতে তুলে দেন, কারণ অধিক দামে বেশি খাবার কেনার সামর্থ্য তাদের নেই।
এই গর্ভাবস্থার খবর পাওয়ার পর আলার মন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একদিকে নতুন সন্তানের আসার আনন্দে তার মন ভরে উঠেছিল, অন্যদিকে মৃত তিন সন্তানের স্মৃতিতে তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়েছে। গর্ভাবস্থায় বিশেষ কিছু খাবারের প্রতি যখন তার আকাঙ্ক্ষা জাগে, তখনই ভেসে ওঠে বড় ছেলে ওয়াসিমের মুখ। তবে ক্লিনিকে গিয়ে তিনি কোনো নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে নিজের সন্তান হারানোর করুণ গল্প শেনান না। কারণ তিনি জানেন, সেই স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেরাও মানসিকভাবে পুরোপুরি বিধ্বস্ত ও ক্লান্ত। গাজায় শোক ভাগ করে নেওয়ার মতো বাড়তি মানসিক শক্তি কারো নেই; আলার মতো হাজারো মা এখানে প্রতিদিন সন্তান হারিয়ে চোখের পানি ফেলছেন।
দুপুরের দিকে পুষ্টিবিদ এবং মাতৃত্বকালীন মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ শেষ করে ধীরে ধীরে তাঁবুতে ফিরে আসেন আলা। মনোবিজ্ঞানী তাঁকে কেবল লম্বা নিঃশ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার মাধ্যমে মন শান্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। বাড়ি ফিরে তিনি সাথে করে নিয়ে আসা একটি নীল রঙের ব্যাকপ্যাক খোলেন। এই ব্যাগের ভেতর রয়েছে তাঁর নিহত তিন সন্তানের কিছু পোশাক। ইসরায়েলি বোমা হামলায় পোশাকগুলোর বেশ কিছু অংশ ছিঁড়ে গেছে, ধারের দিকগুলো পুড়ে কালো হয়ে গেছে, তবুও সেগুলো ধুয়েমুছে পরিপাটি করে রেখেছেন আলা—যদি নতুন আগত সন্তানটিকে এগুলো পরানো যায়। জামাগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি স্নুপি আঁকা টি-শার্ট, দুটি তুলতুলে পম্পম দেওয়া একটি টুপি এবং আয়ারল্যান্ডের কর্কের একটি ছোট ফুটবল ক্লাব ‘ক্যাসেলভিউ এএফসি’-এর একটি স্কার্ফ। ওয়াসিম এই স্কার্ফটি বড্ড ভালোবাসত। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমেও সে এটি গলা থেকে খুলতে চাইত না। আলা যখন তাকে বলতেন, “ওয়াসিম, অনেক গরম, এটা খুলে ফেলো,” ওয়াসিম হেসে উত্তর দিত, “না মা, আমি এটা ভালোবাসি।”
বিকালে ভাইয়ের সাথে বসে কীভাবে পোশাকগুলো নিরাপদ রাখা যায় তা নিয়ে আলোচনা করেন আলা। ভাই একটি শক্ত কার্ডবোর্ড বা কাঠের বাক্সের পরামর্শ দেন। কারণ গাজার এই তাঁবুগুলোতে এখন বড় উপদ্রব হয়ে দাঁড়িয়েছে ইঁদুর। প্রতি রাতে ইঁদুরের দল তাঁবুর কাপড় কেটে ভেতরে ঢোকে। সেলাই করে গর্ত বন্ধ করলে পরদিনই নতুন গর্ত তৈরি করে। ইঁদুরের বিষ ব্যবহারের কথা ভাবলেও ভয়ে পিছিয়ে আসতে হয়, কারণ তাঁবুতেই ইঁদুর মরে পচে গেলে নতুন কোনো মহামারি বা রোগ ছড়াতে পারে। আগত নতুন শিশুটির জন্য আলার চাওয়া কেবল একটি নিরাপদ স্থান, যেখানে ইঁদুর পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু ঘিঞ্জি এই তাঁবুতে একটি ছোট দোলনা রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই। ক্ষোভ আর কষ্টে আলা প্রকাশ করেন, তাঁবুর এই জীবন কতটা অপমানজনক, অবমাননাকর এবং অমানবিক। পৃথিবীর বাইরের মানুষের পক্ষে তা কল্পনা করাও অসম্ভব।
সন্ধ্যা নামলে আলা তার পুরোনো এবং ভাঙা স্ক্রিনের স্মার্টফোনটিতে সংরক্ষিত বাচ্চাদের ছবি ও ভিডিওগুলো দেখতে থাকেন। গাজায় ব্লকেডের কারণে নতুন মোবাইল অত্যন্ত দামি, যা কেনা তাদের সাধ্যের বাইরে। ছোট স্পিকার থেকে ভেসে আসে মেয়ে খাওলা ও ছেলে মুহান্নাদের একে অপরকে নিয়ে মিষ্টি ঝগড়ার আওয়াজ; মা, আমিই সবচেয়ে লক্ষ্মী! খাওলা চিৎকার করে বলে, আর পাশ থেকে মুহান্নাদ হেসে উঠে বলে, না, আমিই বেশি লক্ষ্মী!
এই স্মৃতিগুলো আর বুকের জমানো কান্না আলা কেবল তার স্বামীর সাথেই ভাগ করে নিতে পারেন। কারণ গাজায় তার স্বামীই একমাত্র মানুষ, যিনি এই একই মানসিক যন্ত্রণা বহন করছেন এবং তার হৃদয়ের ব্যথা বুঝতে পারেন। একজন দুর্বল হয়ে পড়লে অন্যজন তাকে সান্ত্বনা দেন, শক্ত আঁকড়ে ধরেন। তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাচ্চাদের আচার-ব্যবহার, পছন্দের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন এবং মাঝে মাঝে সন্তানদের কবরে গিয়ে নীরব অশ্রু বিসর্জন দেন।
যে ভিটেমাটিতে সন্তানরা বড় হয়েছে, যেখানে তাদের লালন-পালন করা হয়েছে, সেটির প্রতিটি ধূলিকণায় জড়িয়ে আছে স্মৃতি। আলা ভালো করেই জানেন, সেই সুন্দর দিনগুলো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তবে নতুন জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুকচাপা ভয়ে শিউরে ওঠেন এই ফিলিস্তিনি মা। সন্তান হারানোর যে দগ্ধ ক্ষত তিনি বহন করছেন, তাতে প্রতিনিয়ত ভয় হয়; নতুন এই সন্তানকেও কি আবার হারিয়ে ফেলবেন? সমস্ত অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যেও তিনি প্রার্থনা করেন, তার পেটের নতুন সন্তান যেন তার ভাই-বোনদের চেয়ে একটি উন্নত, শান্তিময় ও নিরাপদ পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কিউএনবি/অনিমা/২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ১২:৩৪