আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রবল অনুরোধের মুখে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবেন কি না, তা নিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন ট্রাম্প। গত বুধবার তিনি উপদেষ্টাদের জানান যে তিনি হামলার পক্ষে নন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সৌদি যুবরাজ টেলিফোন করে আবারও মার্কিন সামরিক সহায়তার তাগিদ দেন। সেই সময় ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত বদল করেন এবং পেন্টাগনকে হুতিদের ওপর বিমান হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন।
নির্দেশ পাওয়ার পর পেন্টাগনের কমান্ডাররা লক্ষ্যবস্তুর তালিকা চূড়ান্ত করেন। এমনকি যুদ্ধবিমানে বোমা লোড করা হয় এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী নতুন হামলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে ওঠে। হামলা শুরুর মুহূর্ত পর্যন্ত চলেছিল এই প্রস্তুতি। তবে সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত হওয়ার পর গত রবিবার হঠাৎ করেই নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। আপাতত হামলা স্থগিত করা হলেও বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
তবে এক মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সৌদি আরবের সঙ্গে আমেরিকার প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তার মিত্রদের রক্ষা করবে।
সিদ্ধান্ত বদলের নেপথ্যের কারণ
হুতিরা বর্তমান সময়ে মার্কিন জাহাজে আক্রমণ থেকে বিরত রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই না করার বিষয়ে একমত হয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবের ওপর হামলা জোরদার করেছে তারা। এর ফলে ওয়াশিংটন এখন সৌদির মতো এমন এক মিত্রের চাপের মুখে পড়েছে, যাকে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের বৃহত্তর যুদ্ধে ভীষণ প্রয়োজন। সৌদি আরবও এই নির্ভরতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
এর আগে গত মে মাসে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বাণিজ্যিক তেল ট্যাংকার পাহারা দেওয়ার পরিকল্পনা আটকে দিয়েছিল রিয়াদ। তখন তারা মার্কিন বাহিনীকে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি।
বর্তমানে হুতিদের হুমকি কেবল সৌদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি জাহাজে হামলা চালানো ছাড়াও লোহিত সাগরে সৌদি শিপিংয়ের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছে গোষ্ঠীটি। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাবাব-আল-মান্দাব প্রণালীর আশপাশের এলাকা দখল করে নিয়েছে। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে।
ট্রাম্প কেন দ্বিধায় ভুগছেন?
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যেই বিপর্যস্ত। এমন অবস্থায় নতুন করে ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ শুরু করলে আরেকটি নতুন ফ্রন্ট খুলে যাওয়ার বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। এছাড়া, বিমান হামলা চালিয়ে হুতিদের আদৌ পিছু হঠানো যাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক সামরিক কমান্ডার।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালে হুতিদের ওপর ৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বোমা হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় এক হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে গিয়ে প্রথম মাসেই প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ খরচ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলে একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সেই যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে হুতিরা তাদের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই পুনর্গঠন করেছে। এমনকি বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করছে। ফলে নতুন করে হামলা শুরু হলে হুতিরা আবারও মার্কিন জাহাজে আক্রমণ শুরু করতে পারে। এছাড়া. বাবাব-আল-মান্দাব দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত করে বৈশ্বিক জ্বালানি রুটে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
গত রবিবার ট্রাম্প জানান, তিনি বৃহত্তর ইরান যুদ্ধ নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে আছেন। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে হামলার একেবারে দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার পরও আপাতত হুতিদের ওপর আক্রমণ থেকে পিছু হটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তথ্যসূত্র : গালফ নিউজ
কিউএনবি/অনিমা/২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/বিকাল ৪:৪৬