ডেস্ক নিউজ : জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, প্রবাসের শ্রমবাজারসহ কোথাও কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব রাখা হবে না। ফ্যাসিস্ট আমলের সিন্ডিকেট এখনও বহাল রয়েছে। সরকার এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে জনগণকে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা এই সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দেব।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে ‘সিন্ডিকেট ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সুস্থ শ্রমবাজারের পরিবেশের সমস্যাটি শুধু মালয়েশিয়াকে ঘিরে নয়, দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় এবং বিশেষ করে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এটি বেশি হচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বৈধ ভিসাধারী ব্যক্তিরা দুবাই বা আবুধাবি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই কোনো কারণ না জানিয়ে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তাদের বলা হচ্ছে ভিসা অকার্যকর। একটি দেশের নাগরিকরা এভাবে অপমানিত হয়ে ফিরে আসবেন—এটা শুধু তাদের চাকরির অধিকার ক্ষুণ্ণ করা নয়, বরং একটি দেশকে অপমান করার শামিল।
তিনি বর্তমান সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, সরকার কি বসে বসে শুধু সংখ্যা গুনবে, নাকি সমস্যার সমাধান করবে? সপ্তাহের পর সপ্তাহ গড়িয়ে গেলেও এর কোনো সমাধান হচ্ছে না। প্রবাসীদের শুধু ‘রেমিটেন্স যোদ্ধা’ বললে তাদের প্রতি জাতির দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের সম্বোধন উপহাসের সমান।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা লড়াই করেছিলাম প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সফল হয়েছি। তবে এই লড়াইয়ে আমরা বিএনপিকে পাশে পাইনি, বরং তাদের অনেক নেতৃবৃন্দ উল্টো কথা বলেছেন। আমরা পরিষ্কার বলেছিলাম, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত না হলে এবার নির্বাচন হবে না।মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিস্ট আমলের সিন্ডিকেট এখনও বহাল রয়েছে। শুধু বাইরে চাদর বদলানো হয়েছে, ভেতরের রুট ও নেটওয়ার্ক ঠিকই কাজ করছে।
মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজারের সিন্ডিকেটের শেখ নজরুল রহমান ও দাতো আমীনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের আমলেই তিনি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন, যা এখনও সচল রয়েছে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান যদি বাজার উন্মুক্ত রাখতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? অথচ কিছু নেতা গোপনে গিয়ে এই ‘আমিন’দের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তিনি আরও বলেন, ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যাওয়া একজন শ্রমিকের ঋণের বোঝা বইতে গিয়ে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। প্রবাসে সাধারণ শ্রমিকদের বোবা কান্নায় বুক বিষের মতো ভরে রেখেছে। যারা এই জুলুমের সঙ্গে জড়িত, তারা মানুষ নয়, জাতির কলঙ্ক।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যাওয়ার আগে সবাই দরবেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়, কিন্তু লঙ্কায় গিয়ে সবাই রাবণ হয়ে যায়। বর্তমান সরকারও তাই করছে। গণভোটের ঘোষণা, জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ গড়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। স্বাধীন বিচার বিভাগের সেক্রেটারিয়েটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সংস্থায় দলীয় লোকজন বসানো হচ্ছে।
ডিজিটাল সিকিউরিটি নিশ্চিত করার নামে নতুন কোনো কালাকানুন করা হলে তা মুক্তকণ্ঠ স্তব্ধ করার ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের মুক্তকণ্ঠ রোধ করার যেকোনো আইন অগ্রিম ঘোষণা দিয়েই প্রতিহত করা হবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সম্পর্কে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা চাই—বাজার উন্মুক্ত হোক। ২৫টি মাস্টার এজেন্সির আন্ডারে সিন্ডিকেট করার পেছনে ১৫ থেকে ২২ কোটি টাকার বিনিয়োগের যে তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে, সরকারকেই এর ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তিনি ঘোষণা দেন, আমাদের সাত দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনে প্রয়োজনে এই দফাও যুক্ত করে আট দফা করা হবে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা এই সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দেব। নিজের ভাই-ভাতিজাও যদি সিন্ডিকেটে থাকে, তবে সবার আগে সেখানে আঘাত করা হবে।
বায়রা সদস্যদের মাঠে নামার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু পেপার সাপ্লাই দিলে হবে না, যার যার জায়গা থেকে মাঠে নেমে টর্নেডো বা সাইক্লোন সৃষ্টি করতে হবে, যা সমস্ত আবর্জনা পরিষ্কার করে দেবে।
রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, চার-পাঁচ মাস চলে গেলেও দুর্নীতি কমেনি, বরং বেড়েছে। সাধারণ মানুষ ভালো নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট মাইনাস করার চক্রান্ত করা হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সংগঠনের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলাম পার্টির আবদুল মাজেদ আতহারী, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী প্রমুখ।
কিউএনবি/আয়শা/১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:১২