রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২০ অপরাহ্ন

রুকনউদ্দিন বারব শাহের (১৪৫৯–১৪৭৬) আমলেও ঘোড়াঘাট গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্র ছিল

মো আসাদুজ্জামান আসাদ দিনাজপুর প্রতিনিধি ।
  • Update Time : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪৪ Time View
মো আসাদুজ্জামান আসাদ দিনাজপুর প্রতিনিধি : ঘোড়াঘাট বর্তমানে দিনাজপুর জেলার একটি উপজেলা নগরায়নের ইতিহাস প্রাচীন। বামন দিঘিতে পাওয়া রাজা প্রথম মহিপালের (৯৮৮–১০৩৮ খ্রিস্টাব্দ) সময়ের তাম্রলিপি এবং ২০১১ সালে বেলওয়া গ্রামের পাঁড়ুর টিবিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া নিদর্শন থেকে ধারণা করা হয় যে, পাল আমলে এ অঞ্চলে জনবসতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ছিল। তৃতীয় বিগ্রহপালের সময় পর্যন্ত এখানে একটি জনপদ ছিল বলে ধারণা করা হয়।

সুলতানি আমলে ঘোড়াঘাটের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। নিকটবর্তী সুরা মসজিদ এ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তুর্কি শাসনের পর মুসলিম সৈন্য, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের আগমনে নতুন বসতি গড়ে ওঠে এবং মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা ও খানকা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজি বরেন্দ্র অঞ্চল বিজয়ের পর প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কয়েকটি ইকতা প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে ‘বরসৌলা’ ইকতার উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমান ঘোড়াঘাটের উত্তরে ভাদুরিয়া এলাকার বড়শৌলা গ্রামের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। আশপাশের প্রত্ননিদর্শন ও হরিনাথপুর দুর্গ এ অঞ্চলের প্রাচীন সামরিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়।

সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫–১৪৫৯) আমলে ঘোড়াঘাট ‘নাসিরাবাদ’ নামে পরিচিত ছিল এবং এখানে একটি টাকশাল ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে সুলতান রুকনউদ্দিন বারবক শাহের (১৪৫৯–১৪৭৬) আমলেও ঘোড়াঘাট গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্র ছিল। শের শাহের সময় ঘোড়াঘাট ‘সরকার ঘোড়াঘাট’ নামে প্রশাসনিক অঞ্চলে পরিণত হয়। এ সময় পাঠানদের বসতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং ঘোড়াঘাট একটি সামরিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। ১৬শ শতকে মোগল সম্প্রসারণের সময় স্থানীয় পাঠান শক্তির সঙ্গে মোগল বাহিনীর একাধিক সংঘর্ষ হয়।

সম্রাট আকবরের আমলে টোডরমলের রাজস্ব ব্যবস্থার অধীনে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় ১৯টি ‘সরকার’ গঠিত হলে ঘোড়াঘাট তার একটি ছিল। ‘সরকার ঘোড়াঘাট’-এর অধীনে ৮৪টি পরগনা ছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। মোগল ও নবাবি আমলে এখানে ফৌজদার নিয়োগ করা হতো। ফলে ঘোড়াঘাট প্রশাসন, রাজস্ব ও সামরিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

বুকানন হ্যামিল্টন ও কানিংহামের বিবরণ অনুযায়ী, মধ্যযুগীয় ঘোড়াঘাট শহর উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১০ মাইল এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ২ মাইল বিস্তৃত ছিল এবং এটি জনবহুল ছিল। এ নগরকেন্দ্রের প্রধান স্থাপনাগুলোর মধ্যে ছিল ঘোড়াঘাট দুর্গ। সাহেবগঞ্জ মৌজায় অবস্থিত দুর্গের পূর্বে করতোয়া নদী এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে পরিখা ছিল। দুর্গে ফৌজদারের ভবন, প্রশাসনিক স্থাপনা, সেনাছাউনি, আবাসিক ভবন, মসজিদ ও মাদ্রাসা ছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

বর্তমানে দুর্গের অধিকাংশ স্থাপনা বিলুপ্ত হলেও মাটির প্রাচীর, পরিখা, ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ, কবর ও ইদারার চিহ্ন রয়েছে। দুর্গের আশপাশে চম্পাতলীর বাঁধানো ঘাট, উঁচু ঢিবি এবং প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যায়। এগুলো ঘোড়াঘাটের বিস্তৃত নগর ও জনবসতির প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৮শ শতকের মাঝামাঝি ইংরেজ শাসনের বিস্তারের সঙ্গে ঘোড়াঘাটের প্রশাসনিক গুরুত্ব কমতে শুরু করে। ১৭৬৫ সালে ইংরেজ সেনাপতি কট্রিলের সঙ্গে সংঘর্ষে শেষ মুসলিম ফৌজদার মীর করম আলী খান পরাজিত হন।

১৭৮৭ সালের প্রশাসনিক পুনর্গঠনে ঘোড়াঘাট জেলা বিলুপ্ত হয়ে এর প্রশাসনিক দায়িত্ব দিনাজপুরে স্থানান্তরিত হয়। এর ফলে জনবসতি ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যায় এবং পুরনো নগরকেন্দ্র ও দুর্গ ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে ঘোড়াঘাট দুর্গ বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। দুর্গ, পরিখা, মসজিদ, কবর, ইদারা এবং আশপাশের প্রত্ননিদর্শন প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ঘোড়াঘাট নগরের অস্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

 

 

কিউএনবি/আয়শা/০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/দুপুর ১:৪৪

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit