আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক তাদের নতুন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটের আনুষ্ঠানিক নাম ঘোষণা করেছে। এর নাম রাখা হয়েছে ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’। সোমবার ইস্তাম্বুলে তিন দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর জোটটির এই নাম ঘোষণা করা হয়।
বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, জোটের একটি স্থায়ী সচিবালয় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর প্রথম মহাসচিব পাকিস্তানের পক্ষ থেকে নিয়োগ করা হবে বলেও জানান তিনি।
ফিদান বলেন, জোটটি অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার মতো আন্তর্জাতিক নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অন্যান্য দেশকেও এই অংশীদারত্বে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিন দেশের এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন এক মাসের বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলা ছয় মাসেরও বেশি সময়ের সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠার মধ্যেই প্রতিরক্ষা জোটটির পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হলো।
কীভাবে কাজ করবে নতুন জোট?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক গত ৭ আগস্ট মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ছিল—তিন দেশের যেকোনও একটি আক্রান্ত হলে সেটিকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই রাজনৈতিক ঘোষণাকে বাস্তব ও কার্যকর সামরিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছে স্ট্র্যাটেজিক পলিটিক্যাল অ্যান্ড ডিফেন্স কমিটি। সোমবার ইস্তাম্বুলের বৈঠকে এই কমিটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
তবে জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে কোনও সদস্য আক্রান্ত হলে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা কার্যকর হবে, কে সিদ্ধান্ত নেবে এবং সামরিক প্রতিক্রিয়া কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কাঠামো এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বৈঠকে সামরিক সক্ষমতার সমন্বয়, যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন ও গবেষণা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সমন্বয়ের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা, তবে রয়েছে বড় পার্থক্য
তিন দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতিকে অনেকেই ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। ন্যাটোর ওই ধারায় কোনও একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে স্বাধীন বিশ্লেষকদের একটি অংশ এই তুলনায় আপত্তি জানাচ্ছেন। তাদের মতে, নতুন জোটের এখনও ন্যাটোর মতো সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, স্থায়ী সামরিক বাহিনী কিংবা যৌথ সামরিক অবকাঠামো নেই।
ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন মনে করেন, জোটকে কার্যকর করতে একটি স্থায়ী দফতর বা সচিবালয় অপরিহার্য।
তার মতে, এই দফতর তিন দেশের যেকোনও একটিতে হতে পারে অথবা পালাক্রমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে।
তিনি ন্যাটোর ইউরোপভিত্তিক সামরিক সদর দফতরের উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি কার্যকর কমান্ড ও সমন্বয় কাঠামো ছাড়া প্রতিরক্ষা চুক্তিকে বাস্তব সামরিক ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া কঠিন।
কাতার ইউনিভার্সিটির গালফ স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক সিনেম জেঙ্গিজও মনে করেন, জোটের সাংগঠনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিষয়গুলো স্পষ্ট করা জরুরি। তুরস্কের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য পাঠানোর আগে এসব বিষয়ে সমঝোতা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, সংসদীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুক্তির পূর্ণ শর্ত প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনাও কম।
যুদ্ধই হবে জোটের প্রথম বড় পরীক্ষা
নতুন প্রতিরক্ষা জোটের কার্যকারিতা যাচাইয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত।
ইস্তাম্বুলের বৈঠকের মাত্র কয়েক দিন আগে পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির চতুর্থবারের মতো ইরান সফর করেন। গত ২৪ আগস্ট তেহরানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ির সঙ্গে বৈঠক করেন।
পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধ বন্ধ এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে ওই সফরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা এগিয়েছে বলে তারা জানিয়েছিলেন।
তবে ইরান ও পাকিস্তানের এই আশাবাদ ওয়াশিংটনে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। দুই দিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাড়াহুড়ো করছে না’।
এরপর সোমবার হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে ইরানি সেনাবাহিনীর দুটি রকেট লঞ্চারে হামলা চালায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। এক মাসের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্বীকৃত হামলা।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা জোটকে বাস্তবে কীভাবে সক্রিয় করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলও বড় উদ্বেগের কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, তিন দেশের জন্য আরেকটি বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ হলো ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি ‘কৌশলগত আধিপত্যশীল শক্তি’ হিসেবে দেখা হলে তার প্রভাব পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক—তিন দেশের নিরাপত্তার ওপরই পড়ে।
এর একটি উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মক্কায় তিন দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক দিন পর ওই ঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল। স্থানটি তুরস্কের সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে।
ইসরায়েল দাবি করেছিল, তুরস্ক সেখানে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তারা আগাম পদক্ষেপ নিয়েছে।
আঙ্কারা ওই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অভিযোগ করে, এটি তিন দেশের নতুন প্রতিরক্ষা জোটকে দুর্বল করার চেষ্টা।
আর কোন দেশ যোগ দিতে পারে?
তিন দেশের জোটটি অন্য রাষ্ট্রের জন্যও উন্মুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তারা।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ৯ আগস্ট জানিয়েছিলেন, চুক্তিটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং এটি কোনও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তির বিকল্প নয়।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও বলেছেন, ভবিষ্যতে তিন দেশের কাঠামো আরও বিস্তৃত করার আগ্রহ রয়েছে আঙ্কারার।
মিসরের সম্ভাবনা কতটা?
মিসর আগে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে চার দেশের নিরাপত্তা আলোচনায় অংশ নিয়েছে। তবে গত ৭ আগস্টের মূল প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসরকে রাখা হয়নি।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ১৫ আগস্ট এক সাক্ষাৎকারে মিসরের জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেন, চুক্তিটি নতুন সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত।
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি পরে জানিয়েছেন, কায়রো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগে সাংবিধানিক ও আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে। এর মাধ্যমে মিসরের বিদ্যমান আঞ্চলিক চুক্তি ও নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সাবেক কাতারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল-থানি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসির সব সদস্যকে নতুন জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোও কি এগিয়ে আসবে?
জোটের সম্ভাব্য সম্প্রসারণ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে অবশ্য মতভেদ রয়েছে।
বিশ্লেষক এরেলি মনে করেন, মিসরই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সদস্য। তার মতে, আরব কূটনীতিতে মিসরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং তুরস্কের সঙ্গে সাম্প্রতিক সম্পর্কোন্নয়ন দেশটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে সিনেম জেঙ্গিজ মিসরের দ্রুত যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, মিসর ও সিরিয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে নতুন জোটটি কীভাবে এগোয় তার ওপর।
তার দৃষ্টিতে, স্বল্পমেয়াদে কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর এগিয়ে আসার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এসব দেশের সঙ্গে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা অংশীদারত্বে বৈচিত্র্য আনতে আগ্রহী।
তবে বিশ্লেষক করিমের মতে, নতুন কোনও দেশকে সদস্য করার আগে তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশকে সেই দেশের নিরাপত্তার দায় নেওয়ার বিষয়ে একমত হতে হবে। বিশেষ করে কোনও সম্ভাব্য সদস্য নিজেই যদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও জটিল হবে।
তার মতে, মিসর, সিরিয়া কিংবা বাংলাদেশ—যেকোনও একটি দেশ ভবিষ্যতে জোটে যোগ দিতে পারে। তবে এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমঝোতা তৈরি করতে সময় লাগবে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন
সব মিলিয়ে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা জোট ইতোমধ্যে একটি রাজনৈতিক ঘোষণা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে এগোতে শুরু করেছে। রিয়াদে সচিবালয় স্থাপন এবং যৌথ প্রতিরক্ষা কমিটির কার্যক্রম শুরু হওয়া সেই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তবে জোটটির প্রকৃত সক্ষমতা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি কীভাবে কার্যকর হবে, যৌথ সামরিক কমান্ড ও যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হবে কি না, তিন দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে কতটা সমন্বয় সম্ভব হবে এবং সম্ভাব্য নতুন সদস্যদের নিরাপত্তার দায় প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো কতটা নিতে প্রস্তুত।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন নতুন জোটটির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন—‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ কি কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো হয়ে থাকবে, নাকি সময়ের সঙ্গে এটি বাস্তব সামরিক জোটে রূপ নেবে? সূত্র: আল-জাজিরা
কিউএনবি/অনিমা/৩১ অগাস্ট ২০২৬,/রাত ১১:৩৮