মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:১২ অপরাহ্ন
শিরোনাম
বিশ্বকাপে ৫৫ লাখের বেশি বিয়ার বিক্রি জাপানে ভূমিকম্প, শপিং মল ধসে আটকা বহু মানুষ স্ত্রীকে ঝুলিয়ে মারার দৃশ্য ভিডিও কলে শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখাল স্বামী জেলেনস্কিতে মুগ্ধ ট্রাম্প, পুতিনকে দেখছেন ভিন্ন চোখে: রিপোর্ট ভারতে মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক রাশিয়াকে ক্ষেপণাস্ত্র-সেনা দিয়ে ‌‘আখের গোছাচ্ছে’ উত্তর কোরিয়া শিক্ষার্থীদের ওপর ‘পেলেট গানের’ ব্যবহার কেন: সংসদে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর ক্ষোভ পাবলিক-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবধান কমাতে কাজ করছে ইউজিসি ২১ শিক্ষার্থীর প্রাণ গেল, অথচ ধর্মেন্দ্রকে মালা পরালো বিজেপি: কংগ্রেস নেতা আজ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

ভারতে মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১৩ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতের উত্তর প্রদেশের রামপুরে অবস্থিত সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক শুরু হয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টির মধ্যে ৩৮টি ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ এনে এই নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন এবং আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের রামপুরে জুলাইয়ের প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে শতাধিক মানুষ জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

প্রশাসনের অভিযোগ
গত ১৫ জুলাই রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। প্রশাসনের দাবি, ৪০টি ভবনের মধ্যে মাত্র দুটি- যার একটি প্রস্তাবিত মেডিকেল কলেজ ভবন- বৈধ অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হয়েছে। বাকি ৩৮টি ভবন উন্নয়নবিধি লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ৫ আগস্টের মধ্যে ভবনগুলো নিজেরাই অপসারণ করতে বলা হয়। অন্যথায় প্রশাসন বুলডোজার দিয়ে সেগুলো ভেঙে ফেলবে এবং সেই ব্যয়ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদায় করা হবে বলে জানানো হয়।

তবে সোমবার উত্তর প্রদেশ প্রশাসন ওই আদেশের ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়। যদিও এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়নি যে, ভাঙার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন বলেন, এই স্থগিতাদেশের অর্থ কেবল নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ভাঙচুর হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় আদালতের কাছে পুরো ভাঙার আদেশ বাতিলের আবেদন করেছে।

শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ
২৫০ একর আয়তনের ক্যাম্পাসে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে।

২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা উসামা তাইয়্যেব বলেন, যদি শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে একটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করা যায়, তাহলে হাজারো শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মুখে উত্তর প্রদেশ সরকার কেন এই ভাঙার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে না?

১৫ জুলাই থেকে শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে।

আজম খানের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা উত্তর প্রদেশের প্রবীণ মুসলিম নেতা আজম খান। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা মোহাম্মদ আলী জওহরের নামে নামকরণ করা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি গড়ে ওঠে ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্টের মাধ্যমে। তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু হয়।

৭৭ বছর বয়সী আজম খান দীর্ঘদিন সমাজবাদী পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন। তিনি উত্তর প্রদেশ বিধানসভায় ১০ বার নির্বাচিত হন, একাধিকবার মন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরে ভারতের সংসদের উভয় কক্ষেরও সদস্য ছিলেন।

সমর্থকদের মতে, উত্তর ভারতের মুসলিম সমাজে শিক্ষা বিস্তারে তার এই উদ্যোগই তাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।

বিজেপি সরকারের সঙ্গে বিরোধ
২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর আজম খানের বিরুদ্ধে জমি দখল, জালিয়াতি, ঘৃণাত্মক বক্তব্যসহ প্রায় ১০০টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলাই জওহর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে।

আজম খান দুই বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। ২০২২ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাকে জামিন দেয়। পরে জন্মসনদ জালিয়াতি, কর-সংক্রান্ত নথি জাল করা এবং নির্বাচনী প্রচারণায় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন মামলায় তিনি দণ্ডিত হন এবং বর্তমানে দুই বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

তার সমর্থকদের দাবি, এসব মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ। তবে উত্তর প্রদেশ সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

প্রতিহিংসার রাজনীতি
সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য জাভেদ আলী খান অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙার সিদ্ধান্ত শিক্ষা ও সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।

তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়টি আজম খান প্রতিষ্ঠা করেছেন, এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম সিং যাদব এবং উদ্বোধন করেছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। পাশাপাশি এটি একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়। এসব কারণেই এটি সরকারের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী বলেন, এটি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। তার দাবি, আজম খান ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ জমিতে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেছিলেন এবং সরকার কেবল আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

নারী শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রধান প্রক্টর গুলরেজ নিজামির তথ্যানুযায়ী, শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই নারী।

পঞ্চম বর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইকরা বলেন, পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ পরিবেশের কারণে তাকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন।

তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে দেওয়া হলে অনেক মুসলিম মেয়ের উচ্চশিক্ষার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ তাদের পরিবার অন্য কোথাও পড়তে পাঠাতে রাজি হবে না।

তিনি জানান, সরকার বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য কাউন্সেলিং চালু করেছে। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যেতে চান না।

শুধু মুসলিম নয়, হিন্দু শিক্ষার্থীরাও ক্ষুব্ধ
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিক্ষার্থী হিন্দু সম্প্রদায়ের।
প্রথম বর্ষের প্যারামেডিক্যাল শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকর বলেন, এটি আইনগতভাবে সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এখানে কখনও নিজেকে ভিন্ন ধর্মের মানুষ হিসেবে বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সবার সঙ্গে সমান আচরণ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি যুক্তি
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, যে এলাকায় ক্যাম্পাসটি অবস্থিত, সেটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় ছিল না। ফলে ভবন নির্মাণের সময় আরডিএ’র অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না।

উপাচার্য জহিরউদ্দিন বলেন, এখন অতীতের নির্মাণের জন্য অনুমোদন চাওয়া আইনসম্মত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোর্স সরকারের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং সব ধরনের শিক্ষাগত মানদণ্ড পূরণ করেই সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

তার অভিযোগ, সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের চেষ্টা করা হচ্ছে মূলত এর প্রতিষ্ঠাতা আজম খানকে রাজনৈতিকভাবে আঘাত করার জন্য।

পুলিশের চাপের অভিযোগ
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ধর্মঘট ভাঙতে পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী উসমান আলী বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে অন্যরা যেমন দাবি আদায় করতে পারে, তেমনি তারাও বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষার ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দেশটিতে বাড়িঘর, দোকানপাট, মসজিদ ও বিভিন্ন স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের অভিযোগ, এসব অভিযানে মুসলিম সম্প্রদায়ই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও সরকার বলছে, তারা কেবল অবৈধ দখল ও অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধেই অভিযান পরিচালনা করছে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপূর্বানন্দের মতে, জওহর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এই পদক্ষেপের পেছনে একাধিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তার দাবি, এটি একদিকে প্রভাবশালী মুসলিম নেতৃত্বের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা, অন্যদিকে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের চাপের ধারাবাহিকতা। একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলিম শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক মেলবন্ধনের ক্ষেত্র হিসেবেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভাঙার আদেশের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের লড়াই কেবল ভবন রক্ষার জন্য নয়, বরং হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য। সূত্র: আল-জাজিরা

কিউএনবি/অনিমা/২৮ জুলাই ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:২৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

July 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit