মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম

‎ভক্তি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিনত লালমনিরহাটে রথযাত্রায়

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৪০ Time View

‎জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না,  ‎​লালমনিরহাট প্রতিনিধি : ‎​আষাঢ়ের মেঘলা আকাশ আর বাতাসের আর্দ্রতায় প্রকৃতি যখন স্নিগ্ধ, ঠিক তখনই বাংলার জনপদে ধ্বনিত হয় শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর হাজারো কণ্ঠে ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব রথযাত্রার আমেজ এখন দেশের প্রতিটি প্রান্তে। কেবল ধর্মীয় আচার নয়, রথযাত্রা এখন বাঙালির বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক।

‎বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) লালমনিরহাট জেলা শহরের নয়ারহাট এলাকার ইস্কন মন্দির থেকে হাজার হাজার ভক্তবৃন্দদের নিয়ে রথযাত্রা শুরু হয়। রথযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন স্থান ঘুরে জেলা শহরের কালেক্ট্রেট মাঠে এসে সমবেত হয়। এখানে সাতদিন থাকার পর উল্টো রথযাত্রায় আবার ইস্কন মন্দিরে গিয়ে যাত্রা সমাপ্তি হবে। এই সাতদিনে কালেক্টরেট মাঠে মেলা অনুষ্ঠিত হবে। ‎​হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, রথযাত্রা হলো ভগবান জগন্নাথ, তার বড় ভাই বলরাম এবং বোন সুভদ্রার বার্ষিক রথবিহার।

নিজ মন্দির থেকে রথে চড়ে মাসির বাড়ি, গুণ্ডিচা মন্দিরে যাওয়ার এই আখ্যান ভক্তদের মনে গভীর ভক্তির সঞ্চার করে। সাত বা নয় দিন পর ‘উল্টো রথ’ বা ‘বাহুদা যাত্রা’র মাধ্যমে তাদের মূল মন্দিরে প্রত্যাবর্তন ঘটে। ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, রথের দড়ি স্পর্শ করলে বা টানলে পুণ্য লাভ হয় এবং পাপ মোচন হয়। তাই রথের দড়ি ধরার জন্য শিশু থেকে প্রবীণ সব বয়সী মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা উৎসবটিকে দেয় ভিন্নমাত্রা।
‎​
‎​ভারতের ওড়িশার পুরী জগন্নাথ মন্দিরে প্রায় এক হাজার বছর ধরে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। সময়ের পরিক্রমায় এটি বিশ্বের অন্যতম বৃিহত্তম ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও কয়েকশ বছর ধরে ঢাকার শাঁখারীবাজার, রামকৃষ্ণ মিশন, ইসকন মন্দিরসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটের মতো জনপদগুলোতে অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে এই উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে।
‎​
‎​রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে মন্দিরগুলোতে বিশেষ পূজা, কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা ও প্রসাদ বিতরণের আয়োজন করা হয়। রথযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো বর্ণিল মেলা। মাটির তৈজসপত্র, নাগরদোলা, খেলনা এবং লোকজ হস্তশিল্পের পসরা সাজিয়ে বসা এই মেলাগুলো স্থানীয় অর্থনীতিতেও আনে সচলতা। আধুনিক যুগে ফেসবুক লাইভ কিংবা ডিজিটাল প্রচারণায় রথযাত্রার আবেদন আরও বেড়েছে, তবে কাঠের তৈরি সেই ঐতিহ্যবাহী রথ আর ভক্তদের আবেগ এখনো উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
‎​
‎​বাংলাদেশের রথযাত্রার সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল দিক হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বী নয়, নানা ধর্ম ও মতের মানুষ এই উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। রথের রশিতে হাত রেখে টান দেওয়ার দৃশ্যটিই বলে দেয়, ধর্মীয় বৈচিত্র্য সত্ত্বেও এদেশের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের ভিত্তি কতটা মজবুত। এটিই বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।
‎​
‎​উৎসবকে নির্বিঘ্ন করতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ও শোভাযাত্রার রুটে পুলিশ, র‍্যাব ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা ও মেডিকেল টিমের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি ভক্ত নিশ্চিন্তে উৎসবে শামিল হতে পারেন। এছাড়াও আলোকিত লালমনিরহাটের সদস্যরা রথযাত্রা সুষ্ঠু ভাবে পালন করতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে।
‎​
‎​ধর্মীয় নেতাদের মতে, রথযাত্রার মূল দর্শন কেবল পূজা-অর্চনা নয়, বরং মানবতা, সহনশীলতা ও সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছড়িয়ে দেওয়া। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই উৎসবকে কেবল ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, বরং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে লালন করে আসছে। ‎​আষাঢ়ের এই রথযাত্রা আমাদের প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয়, বৈচিত্র্যের মাঝেই আমাদের শক্তি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাই আগামীর বাংলাদেশের পথচলার মূল পাথেয়।

‎কিউএনবি/আয়শা/১৬ জুলাই ২০২৬,/রাত ৮:৩৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit