স্পোর্টন ডেস্ক : ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু স্ট্রাইকার আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গোল করার শিল্প। গ্যাব্রিয়েল ওমর বাতিস্তুতা ছিলেন সেই বিরল শ্রেণির একজন। তিনি শুধু গোল করতেন না, গোলকে রূপ দিতেন একেকটি শিল্পকর্মে। তার শক্তিশালী শট, নিখুঁত ফিনিশিং এবং অদম্য লড়াকু মানসিকতা তাকে পরিণত করেছিল ফুটবল বিশ্বের অন্যতম স্মরণীয় স্ট্রাইকারে। গোল করার এ অসাধারণ ক্ষমতার জন্য তিনি শুধু আর্জেন্টিনারই নন, বিশ্ব ফুটবলেরও এক কিংবদন্তি। ইতালিয়ান সিরি আ ও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে তার গোলবন্যা এনে দিয়েছিল তাকে অমর খ্যাতি। মাঠে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘বাতিগোল’ নামে, আর ক্যারিয়ারের শেষভাগে রোমায় পেয়েছিলেন আরেকটি উপাধি—‘এল রে লিওন’ বা ‘সিংহরাজ’।
২০০০ সালের মার্চ মাসে ইংল্যান্ডের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে একটি ম্যাচে ফুটবল বিশ্ব আবারও দেখেছিল ‘বাতিগোল’-এর আসল রূপ। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে বল পেয়ে তিনি প্রথমে ফাঁকি দেন ডিফেন্ডার ইয়াপ স্টামকে। এরপর যে শটটি নেন, সেটি বজ্রপাতের মতো ছুটে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে জালে। গোলরক্ষক রেমন্ড ফন ডের গাউয়ের কিছুই করার ছিল না। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ওল্ড ট্র্যাফোর্ড।
অনেক ফুটবলপ্রেমীর মতো সেই গোলই অসংখ্য তরুণ সমর্থকের কাছে বাতিস্তুতাকে এক বিস্ময়ের নাম করে তোলে। নয় বছরে ফিওরেন্তিনার জার্সিতে ২০০-এর বেশি গোল করেন বাতিস্তুতা। অনেকের মতে, তিনিই ক্লাবটির সর্বকালের সেরা ফুটবলার এবং নিঃসন্দেহে অন্যতম সেরা গোলদাতা। ফিওরেন্তিনার হয়ে তিনি জিতেছেন ১৯৯৬ সালের ইতালিয়ান কাপ ও ইতালিয়ান সুপার কাপ। ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে টানা ১১ ম্যাচে গোল করে গড়েছিলেন নতুন রেকর্ড। সেই মৌসুমে তার গোলসংখ্যা ছিল ২৬। ১৯৯৮ সালে তিনি সিরি আ’র বর্ষসেরা বিদেশি খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।
২০০০ সালে ফুটবল ইতিহাসের সে সময়ের অন্যতম ব্যয়বহুল ট্রান্সফারের মাধ্যমে তিনি যোগ দেন এএস রোমায়। ফিওরেন্তিনায় দীর্ঘ সময় কাটিয়েও যে সিরি আ শিরোপা জেতা সম্ভব হয়নি, রোমায় গিয়েই প্রথম মৌসুমে সেই স্বপ্ন পূরণ করেন। ২০০০-০১ মৌসুমে ২০ গোল করে রোমাকে স্কুডেত্তো জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। রোমার হয়ে জিতেছেন ইতালিয়ান সুপার কাপও। 
২০০৩ সালে অল্প সময়ের জন্য ইন্টার মিলানে লোনে খেলেন বাতিস্তুতা। এরপর যোগ দেন কাতারের আল-আরাবি ক্লাবে। ২০০৩-০৪ মৌসুমে ২৫ গোল করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং দলকে শিরোপা জিততেও সামনে থেকে ভূমিকা রাখেন।
রোজারিও থেকে যাত্রা
আর্জেন্টিনার তৃতীয় বৃহত্তম শহর রোজারিওতে শুরু হয়েছিল বাতিস্তুতার ফুটবল যাত্রা। স্থানীয় ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব একাডেমিতে তার প্রতিভা প্রথম নজরে আসে কোচ হোর্হে গ্রিফার। পরিবারের প্রতি গভীর টান এবং পড়াশোনার কারণে প্রথমে দ্বিধায় থাকলেও ক্লাব কর্তৃপক্ষ শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিলে পেশাদার ফুটবলের পথে পা বাড়ান তরুণ বাতিস্তুতা।
নিউয়েলসের একাডেমিতে দ্রুতই নিজেকে প্রমাণ করেন তিনি। ১৯৮৮ সালে প্রথম দলে অভিষেকের পর কোপা লিবার্তাদোরেসের ফাইনালেও খেলেন। শক্তি, গতি এবং গোল করার সহজাত ক্ষমতার কারণে সমর্থকেরা তাকে ডাকতে শুরু করেন ‘দ্য অ্যানিমাল’ নামে।
তবে বাতিস্তুতার সংগ্রামের গল্পও কম অনুপ্রেরণাদায়ক নয়। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর জীবিকা নির্বাহের জন্য মাঠের ঘাস কাটা, জানালা পরিষ্কার করা এবং গ্যালারির আবর্জনা পরিষ্কারের মতো কাজও করেছেন এ তারকা ফুটবলার। ফুটবল খেলে যাওয়ার সুযোগটুকুই তখন ছিল তার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নতুন চ্যালেঞ্জের সন্ধানে রোমায় যোগ দেন বাতিস্তুতা। সেখানে ফ্রান্সিস্কো টট্টির সঙ্গে গড়ে ওঠে দুর্দান্ত বোঝাপড়া। অবশেষে ২০০০-০১ মৌসুমে জেতেন কাঙ্ক্ষিত সিরি আ শিরোপা।
এটি ছিল রোমার ১৮ বছরের অপেক্ষার অবসান এবং বাতিস্তুতার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ক্লাব সাফল্য। ফিওরেন্তিনা ছেড়ে ট্রফি জিতলেও ফ্লোরেন্সের সমর্থকদের ভালোবাসা কখনো হারাননি তিনি।
৩৩ বছর বয়সে এসে ফর্ম হারিয়ে ফেলেন বাতিস্তুতা। রোমা তাকে ইন্টার মিলানের কাছে লোনে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে তিনি ১২ ম্যাচে ২ গোল করেন। গোল কম করলেও অনেকগুলো অ্যাসিস্ট করেছিলেন বাতিস্তুতা। এরপর তিনি ফ্রি ট্রান্সফারে ২০০৩ সালে ৮ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কাতারের আল-আরাবিতে যোগদান করেন। সেখানে তিনি এক সিজনে ২৫ গোল করেন, যা ছিল কাতারী লীগের এক সিজনে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। এ রেকর্ড করতে গিয়ে তিনি কাতারি লিজেন্ড মানসুর মুফতাহর গোলের রেকর্ড ভঙ্গ করেন। সেখানে নিয়মিত গোল করলেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তার সময় শেষ হয়ে এসেছে।
২০১৪ সালে আর্জেন্টিনার টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বাতিস্তুতা বলেন, ২০০৫ সালে অবসরের পর তার গোড়ালিতে এত প্রচন্ড ব্যথা ছিল যে, কয়েক ধাপ দূরে টয়লেট থাকলেও এই স্ট্রাইকার বাধ্য হয়ে বিছানাতেই প্রস্রাব করতেন। তিনি একদমই নড়াচড়া করতে পারতেন না। পরিচিত এক ডাক্তারের কাছে গিয়ে তাকে তিনি বলেছিলেন, তিনি যাতে তার পা কেটে ফেলে দেন। কিন্তু ডাক্তার তার অনুরোধ রাখেননি। যদিও এরপর বাতিস্তুতা কার্টিলেজ এবং টেন্ডনের উপড় চাপ কমানোর জন্য একটি সার্জারি করান, যা তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি করে। ২০১৭ সালে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বাতিস্তুতা বলেন, হাঁটতে তার এখনো বেশ কষ্ট হয়। -6a35372f1c71b.jpg)
বিশ্বকাপের অপূর্ণতা
ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য পেলেও বিশ্বকাপ তার কাছে রয়ে গেছে অপূর্ণতার গল্প। ১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২—তিনটি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে গ্রিসের বিপক্ষে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। ম্যাচের ২য়, ৪৪তম ও ৯০তম মিনিটে গোল করেছিলেন। সেই ম্যাচটা স্মরণীয় হয়ে আছে আরেকটা কারণে। আর্জেন্টিনার ৪-০ গোলের জয়ের অন্য গোলটি করেছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। সেই বিশ্বকাপে সেটিই ছিল ম্যারাডোনার একমাত্র গোল। এরপর সেই বিশ্বকাপেই ড্রাগ পরীক্ষায় ফেল করে নিষিদ্ধ হন ম্যারাডোনা, আর্জেন্টিনাও বিদায় নেয় দ্বিতীয় রাউন্ডে রোমানিয়ার কাছে হেরে।
চার বছর পর আরও একবার হ্যাটট্রিক বাতিস্তুতার। এবার জ্যামাইকার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন ম্যাচের ৭২ থেকে ৮২ মিনিটের মধ্যে। দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ফুটবলার এখন পর্যন্ত বাতিস্তুতাই। তবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ডেনিস বের্গক্যাম্পের স্মরণীয় গোলে নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
২০০২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের কাছে হার এবং সুইডেনের সঙ্গে ড্রয়ের ফলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় দলকে। সুইডেন ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বাতিস্তুতা। তিনি জানতেন, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২—তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে মোট ১০ গোল করেন বাতিস্তুতা। দীর্ঘদিন এ তারকা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। জাতীয় দলের হয়ে ৭৮ ম্যাচে ৫৪ গোল করে বহু বছর আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের দখলে রেখেছিলেন। ২০১৬ সালে সেই রেকর্ড ভেঙে দেন লিওনেল মেসি।
আজও বাতিস্তুতা একমাত্র ফুটবলার, যিনি দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি গড়েছেন। -6a3535d0e0688.jpg)
তবে বিশ্বকাপ ছাড়া আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে বাতিস্তুতার সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয় বলা যায়। ১৯৯১ সালে কোপা আমেরিকায় ৬ গোল করে হলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোল স্কোরার। তার কাঁধে ভর করে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা হল কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন। ১৯৯২ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপে আর্জেন্টিনা গেল কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। সেখানেও দেখা গেল বাতিস্তুতা ম্যাজিক। আর্জেন্টিনা জিতে নিল আরেকটি শিরোপা। বাতিস্তুতা হলেন সর্বোচ্চ গোল স্কোরার। ১৯৯৩ সালে আর্জেন্টিনা বাতিস্তুতাকে নিয়ে আরেকটি শিরোপা জেতে। শিরোপাটির নাম আর্তেমিও ফ্রেঞ্ছি ট্রফি। এ টুর্নামেন্ট এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এটি খেলা হত সাউথ আমেরিকা এবং ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন দুটি দলের মধ্যে।
১৯৯৩ সালেই বাতিস্তুতা তার ২য় কোপা আমেরিকা খেললেন আর্জেন্টিনার হয়ে। এবারের কোপা আমেরিকার আসর বসল ইকুয়েডরে। এবারও আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং কোপা আমেরিকার ২য় সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন বাতিস্তুতা। আর্জেন্টিনা শিরোপা ধরে রাখে কোপা আমেরিকার। ১৯৯১ ও ১৯৯৫ সালের কোপা আমেরিকায় বাতিস্তুতা সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জেতেন। ফুটবলে তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে বাতিস্তুতাকে জায়গা দেওয়া হয় ফিফা ১০০ তালিকায়, যেখানে বিশ্বের ১২৫ জন সেরা জীবিত ফুটবলারের নাম স্থান পেয়েছিল। -6a3535e834f14.jpg)
২০০৫ সালে ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর বাতিস্তুতা বেছে নেন একেবারেই ভিন্ন জীবন। কিছুদিন নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে পুরোপুরি মনোযোগ দেন কৃষিকাজে। ২০০৭ সালে আর্জেন্টিনায় ফিরে তিনি কৃষিখাতকে নিজের নতুন কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।
বর্তমানে সান্তা ফে প্রদেশে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির একটি বিশাল খামার পরিচালনা করেন তিনি। সেখানে সয়াবিন, ভুট্টা ও সূর্যমুখী চাষের পাশাপাশি গবাদিপশু পালনও করা হয়। কৃষিখাত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কার্যক্রমেও নিয়মিত অংশ নেন সাবেক এ তারকা ফুটবলার।
ফুটবল মাঠে গোলের পর গোল করে কোটি ভক্তের হৃদয় জয় করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। অবসরের পরও তিনি থেমে থাকেননি। শুধু কর্মক্ষেত্র বদলেছে, বদলায়নি সাফল্যের গল্প। গোলের রাজা থেকে কৃষিক্ষেত্রের সফল উদ্যোক্তা—বাতিস্তুতার জীবন তাই অনুপ্রেরণার এক অনন্য উদাহরণ।
‘বাতিগোল’ কেন অনন্য
গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা শুধু একজন গোলদাতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন আবেগ, লড়াই, বিশ্বস্ততা এবং নিষ্ঠার প্রতীক। আধুনিক ফুটবলে যখন অনেক খেলোয়াড় দ্রুত সাফল্যের খোঁজে ক্লাব বদল করেন, তখন বাতিস্তুতা দেখিয়েছিলেন ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং সংগ্রামের মূল্য কতটা।
তার গোলগুলো আজও ইউটিউবের ভিডিও নয়, ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে জীবন্ত। শক্তিশালী শট, দুর্দান্ত ফিনিশিং আর অবিশ্বাস্য লড়াকু মানসিকতার জন্য তিনি চিরকাল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ফুটবল বিশ্ব তাকে যেন এক নামেই মনে রেখেছে—‘বাতিগোল’।
কিউএনবি/আয়শা/১৯ জুন ২০২৬,/রাত ৮:১৫